উপলক্ষ খামেনির মৃত্যু, পরিণতিতে আমেরিকার আত্মসমর্পণ: ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য ট্র্যাজেডি

১০৭

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানজুড়ে যখন মার্কিন ও ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানগুলো বিনা উসকানিতে বোমাবর্ষণ শুরু করেছিল, তখন ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের নীতিনির্ধারকদের চোখে ছিল পারস্যের শাসনব্যবস্থা গুঁড়িয়ে দেওয়ার খোয়াব। প্রথম দিনের হামলাতেই প্রাণ হারান ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং বেশ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তখন দাম্ভিকতার সাথে ঘোষণা করেছিলেন, খামেনির মৃত্যুর সঙ্গেই ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থার কবর রচিত হয়েছে। ইরানকে তখন ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ করার হুঁশিয়ারিও দিয়েছিলেন তিনি।

কিন্তু যুদ্ধ শুরুর মাত্র সাড়ে তিন মাসের মাথায় আজ সোমবার (১৫ জুন) সেই ডোনাল্ড ট্রাম্পকেই ইরানের সাথে স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধ ও বৈরিতা অবসানের জন্য একটি শান্তিচুক্তির ঘোষণা দিতে হলো। যে চুক্তিকে খোদ মার্কিন জনপ্রতিনিধিরাই এখন ওয়াশিংটনের জন্য এক ‘ভয়াবহ পরাজয়’ ও ‘আত্মসমর্পণের দলিল’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এমএস নাউ-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রভাবশালী কংগ্রেসম্যান সেথ মোল্টন স্পষ্ট করেই বলেছেন, ‘এটি একটি ভয়াবহ চুক্তি। এটি মূলত ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে ইরানের বর্তমান নেতৃত্বের কাছে স্রেফ একটি আত্মসমর্পণের দলিল।’

কী আছে এই ‘ভয়াবহ’ চুক্তিতে?

চুক্তির ধারাগুলোর দিকে চোখ বুলালে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের এই ক্ষোভের কারণ সহজেই অনুধাবন করা যায়। এই শান্তিচুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ওয়াশিংটনকে অবিলম্বে ইরানের জব্দকৃত সব সম্পদ ছেড়ে দিতে হবে। ক্রমান্বয়ে প্রত্যাহার করে নিতে হবে ইরানের ওপর আরোপিত সব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা। শুধু তাই নয়, মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস করার পাশাপাশি যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনের জন্য তেহরানকে মোটা অঙ্কের আর্থিক সহায়তা দিতেও বাধ্য থাকবে আমেরিকা।

প্রশ্ন উঠেছে, এতসব ছাড়ের বিপরীতে পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র নিজে কী পেল? বিনিময়ে ওয়াশিংটনের ঝুলিতে পড়েছে কেবল একটি মৌখিক প্রতিশ্রুতি, ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা সংগ্রহ করবে না। আর যুদ্ধ শুরুর পর বন্ধ হয়ে যাওয়া কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির দুয়ার আবারও উন্মুক্ত হবে।

অথচ, গত ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লক্ষ্য শুধু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির অবসান-ই ছিল না; বরং তারা চেয়েছিল তেহরানের বর্তমান সরকারব্যবস্থার পতন ঘটিয়ে সেখানে একটি ‘পুতুল সরকার’ বসাতে। মধ্যপ্রাচ্যের লেবানন, ইয়েমেন বা সিরিয়ায় ইরানপন্থি গোষ্ঠীগুলোর কর্মকাণ্ড চিরতরে বন্ধ করে পারস্যের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়াই ছিল ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মূল লক্ষ্য।

কাগুজে সাফল্য ও ধোঁকা

ইরান যে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেটিকে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সাফল্য বলার কোনো সুযোগ নেই। কারণ তেহরান বরাবরই বলে এসেছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির উদ্দেশ্য অস্ত্র তৈরি নয়, বরং শান্তিপূর্ণ ব্যবহার। ফলে যে নিশ্চয়তা ইরান আগে থেকেই দিয়ে রেখেছিল, সেটিকে নতুন চুক্তির শর্ত বানিয়ে সাফল্য দাবি করা নিজেদের ধোঁকা দেওয়ার শামিল। অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালি বন্ধই হয়েছিল মার্কিন ও ইসরায়েলি আগ্রাসনের কারণে। ফলে যুদ্ধ থামলে সেটি এমনিতেও খুলত; একে ট্রাম্পের কূটনৈতিক বিজয় ভাবার কোনো কারণ নেই।

নেতানিয়াহুর সাথে দূরত্ব ও আরব মিত্রদের মোহভঙ্গ

এই শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের আগে আরেকটি বিষয় বিশ্বমঞ্চে স্পষ্ট হয়েছে, তা হলো নেতানিয়াহুর সঙ্গে ট্রাম্পের উষ্ণ সম্পর্কে চরম ভাটা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট দেরিতে হলেও বুঝতে পেরেছেন, ইসরায়েল আসলে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো ধরনের স্থিতিশীলতার বিরোধী। মার্কিন আলোচকরা যখন দিনরাত এক করে তেহরানের সাথে আলোচনার টেবিলে ব্যস্ত, তখন বারবার লেবাননে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে এই শান্তিপ্রক্রিয়াকে নস্যাৎ করতে চেয়েছিল ইসরায়েল। দেশটির এমন উগ্র আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে ট্রাম্প একপর্যায়ে নেতানিয়াহুকে ‘পাগল’ এবং সবশেষ ‘বিচার-বিবেচনাহীন ব্যক্তি’ হিসেবে বর্ণনা করতে বাধ্য হন।

একই সাথে পরোক্ষভাবে আরব মিত্রদের সঙ্গেও আমেরিকার সম্পর্কের মারাত্মক অবনতি হয়েছে। যে আরব দেশগুলো নিজেদের ভূখণ্ডে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি গাড়তে দিয়েছিল নিরাপত্তার আশায়, এই যুদ্ধের কারণে উল্টো তাদেরই নিরাপত্তা ও অর্থনীতি ধসে পড়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের এতদিনের একচ্ছত্র ক্ষমতাবলয় এখন খাদের কিনারে।

বাস্তবতা হলো, মাত্র একটি হরমুজ প্রণালি সচল করার জন্য ইরানকে যেভাবে দুহাত উজাড় করে ছাড় দিতে হয়েছে, তাতে মার্কিনীদের জন্য এখন বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে মুখ বাঁচানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই কংগ্রেসম্যান সেথ মোল্টনের সুর মিলিয়েই বলা যায়, এই চুক্তি ইরানের পরমাণু কর্মসূচি থামানোর চেয়েও বেশি, মার্কিন বাহিনীকে লেজ গুটিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন এবং আরও বড় আন্তর্জাতিক লিগ্যাল ও রাজনৈতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাওয়ার একটি মরিয়া চেষ্টামাত্র।