‘ঝুলন্তই থাকবে’—সেই নির্দেশ থেকে ১৭ বছরের নির্বাসন

২০০৭ সালের ৭ মার্চ। মইনুল রোডে খালেদা জিয়ার বাসার চারপাশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঘেরাও। কোনো মামলা-অভিযোগ ছাড়াই সেদিন তুলে নেওয়া হয় তারেক রহমানকে। সেনা সদর দপ্তরে জেনারেল মইন ও ব্রিগেডিয়ার এটিএম আমিনের বৈঠকের পর কর্নেল ইমরান বাসার ভেতরে ঢুকে তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করেন। তারেক বের হতেই তাকে গাড়িতে তোলা হয়। কিছুদূর যেতেই রানার তারেকের মুখ কালো কাপড়ে ঢেকে দেন। জানালা খুলতে চাইলে ‘নিরাপত্তার কারণ’ দেখিয়ে নাকচ করে দেন মেজর ইমরান।

এরপর ডিজিএফআই-এর জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল। সিটিআইবির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্নেল সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দারের নির্দেশে শুরু হয় গালিগালাজ, চোখ বাঁধা, হাত বেঁধে সিলিংয়ে ঝুলিয়ে রাখা। ওয়ারেন্ট অফিসার ফজলুর জবানবন্দি বলছে, ব্রিগেডিয়ার আমিনের হুকুম ছিল, ‘পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ঝুলন্তই থাকবে।’ টানা তিন-চারদিন পর সিলিং থেকে পড়ে কোমরে মারাত্মক আঘাত পান তারেক।

২০০৭ সালের ডিসেম্বরে দ্বিতীয় দফায় জেআইসিতে আনা হয়। এবার সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার, আব্দুর রব খান, জাহিদ হোসেন ও মেজর মনিরের উপস্থিতিতে জোর করে ‘জাতির কাছে ক্ষমা’ চাওয়ার স্বীকারোক্তি রেকর্ড করানো হয়। অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আব্দুর রব খান পরে স্বীকার করেন, এটিএম আমিনের নির্দেশেই এটা করানো হয়েছিল।

২০০৮ সালের জানুয়ারিতে নানি মারা গেলে প্যারোলে বের হয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছিলেন তারেক। লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী সেটা দেখে সেনাপ্রধান মইনের কাছে কৈফিয়ত চান। এ নিয়ে দুজনের তীব্র বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। মাসুদের দাবি, তারেক নিকটাত্মীয় হওয়ায় মইন তাকে পিএসও করে দূরে পাঠান। নির্যাতনের সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন না।

এ ঘটনায় সাত সেনা কর্মকর্তার নাম উঠে এসেছে: ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এটিএম আমিন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল চৌধুরী ফজলুল বারী, লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার, লেফটেন্যান্ট কর্নেল আফজাল নাছের চৌধুরী, লেফটেন্যান্ট কর্নেল আব্দুর রব খান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. ফরিদ উদ্দিন ও মেজর মনির।

টানা নির্যাতনে প্রায় পঙ্গু হয়ে যান তারেক রহমান। বছরের পর বছর হাসপাতাল ঘুরে ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর এক অঙ্গীকারপত্রে সই করিয়ে তাকে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়। শুরু হয় ১৭ বছরের লন্ডন জীবন।