‘পদ্মা ব্যারেজ’ প্রকল্পের অনুমোদন দিলো সরকার

চলতি অর্থবছরের ১১তম এবং বিএনপি সরকারের তৃতীয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে অনুমোদন পেয়েছে ১৬টি প্রকল্প। এরমধ্যে রয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকার ‘পদ্মা ব্যারেজ’ প্রকল্প।

এতে রাজবাড়ীসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার কোটি মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন অবশেষে সত্যি হতে চলেছে। বাস্তবায়িত হতে যাওয়া এই প্রকল্পকে ঘিরে নদীমাতৃক বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বইছে আনন্দের জোয়ার।

এ অঞ্চলের মানুষের বিশ্বাস, এই ব্যারাজ কেবল একটি স্থাপনা নয়, বরং এটি এই অঞ্চলের কৃষি, মৎস্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার প্রাণভোমরা হয়ে দাঁড়াবে। তারা মনে করছেন, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এটি হবে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রকল্প।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হলে দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি ও শিল্পায়নে এক নতুন যুগের সূচনা হবে, যা জাতীয় জিডিপিতেও বড় অবদান রাখবে।

ঘুরে দাঁড়াবে কৃষি ও অর্থনীতি

রাজবাড়ী ও আশেপাশের জেলার কৃষকরা দীর্ঘদিন ধরে পানির অভাবে শুষ্ক মৌসুমে ফসল উৎপাদনে হিমশিম খাচ্ছিলেন। ব্যারাজটি নির্মিত হলে প্রায় ত্রিশ লাখ হেক্টর জমি সেচ সুবিধার আওতায় আসবে। এতে করে বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকার বাড়তি ফসল উৎপাদন সম্ভব হবে বলে আশা করছেন কৃষি বিশেষজ্ঞরা। এছাড়া, নদীতে পানির প্রবাহ ফিরলে দেশীয় মাছের অভয়াশ্রম তৈরি হবে, যা স্থানীয় মৎস্যজীবীদের ভাগ্য বদলে দেবে। ফলে এ স্বপ্ন বাস্তবায়নে আশায় বুক বাঁধছে স্থানীয়রা।

প্রকল্পের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পাংশা ও জেলা সদরের বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা দেখা গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, তারা বছরের পর বছর পদ্মার চরে ধুলো উড়তে দেখেছেন। গড়াই নদী শুকিয়ে মরে যাচ্ছে। এখন ব্যারাজ হলে তাদের এলাকা আবার সবুজে ভরে উঠবে, ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়বে।

পদ্মার বুকে বিশাল বাধ নির্মিত হলে চার লেনের সড়ক নির্মিত হবে। তাতে নদীতে  পরিবেশ ও পর্যটন সম্ভাবনা বাড়বে।

ব্যারাজকে কেন্দ্র করে রাজবাড়ীর পাংশা অঞ্চলে পর্যটনের এক নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। বিশাল এই স্থাপনা দেখতে দেশি-বেশি পর্যটকদের আগমন ঘটবে, যা স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আয়ের পথ সুগম করবে। একইসঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এটি হবে একটি মাইলফলক। এ অঞ্চলের মানুষের মিলবে অর্থনৈতিক মুক্তি।

ফারাক্কার প্রভাবে পদ্মা ও এর শাখা নদীগুলো পানি শূন্যতার কারণে শুস্ক মওসুমে পদ্মার দুই পারে বিপুল পরিমাণ জমি-জমায় ধু-ধু বালুচরে পরিণত হয়। পদ্মা ব্যরেজ হলে সেইসব জমিতে পর্যপ্ত সেচ সুবিধা ও লবণাক্ত নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।

প্রকল্পের আওতায় বিশাল একটি অঞ্চলে সেচ নেটওয়ার্ক তৈরি করা হবে, যা সরাসরি কৃষিপণ্য উৎপাদনে বিপ্লব ঘটাবে। সেই সাথে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ বৃদ্ধি পেলে দক্ষিণাঞ্চলের সুন্দরবন সংলগ্ন জেলাগুলোতে লবণাক্ততার আগ্রাসন উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে।

উল্লেখ্য, ১৯৬০-এর দশক থেকেই রাজবাড়ী, ফরিদপুর, খুলনা, বরিশাল ও রাজশাহী অঞ্চলের নদী, কৃষি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের দাবি ওঠে। পরে ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর পদ্মা নদীর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় বিষয়টি আরও গুরুত্ব পায়।

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিএনপি। সরকার গঠনের পর সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে এই অনুমোদনকে।