শততম টেস্টে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়

২৩

সালেক উদ্দিন মালেক : টেস্ট ম্যাচও যে চরম রোমাঞ্চকর পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে! তাও কী না চতুর্থ ইনিংসে! হ্যাঁ, সেই রোমাঞ্চকর উত্তেজনার ম্যাচে শেষ হাসি হেসেছে বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের ৩২ কোটি চোখের স্বপ্নের নায়কদের ব্যাট। আচ্ছা, আপনি সব শেষ মুশফিকের দুই হাতে ব্যাট তুলে প্রাণ জুড়ানো গৌরবের হাসিমাখা মুখ কবে দেখেছেন … ।

এমন হাসি পাষাণের বুকেও মায়ার মমতা বুলিয়ে দিতে বাধ্য!

শ্রীলঙ্কার মাটিতে বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কাকে হারাল ৪ উইকেটে। ক্রিকেট ইতিহাসের চতুর্থ দল হিসেবে শততম ম্যাচে জয় পেল বাংলাদেশ। এর আগে এ তালিকায় ছিল অস্ট্রেলিয়া, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও পাকিস্তান। বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে এটি অনন্য এক অর্জন।

 

মেহেদী হাসান মিরাজের ব্যাট থেকে জয়সূচক রান আসার সাথে সাথে গর্জে উঠে বাংলাদেশ। ড্রেসিংরুম থেকে দৌড়ে মাঠে ঢুকেনসৌম্য সরকার, তাসকিন আহমেদ, রুবেল হোসেন ও অন্যান্যরা। ক্রিজে থাকা মিরাজ ও মুশফিকের উল্লাস ছিল চোখে পড়ার মত। এরপর পি. সারার ওভালে যোগ দেয় পুরো স্কোয়াড। মাঠের ক্রিকেটে টাইগাররা যখন জিতে যায় বাংলাদেশের হয়ে তখন জিতে যায় পুরো বাঙালি, পুরো বাংলাদেশ। হৈ-হুল্লোড় ও নেচে-গেয়ে জয়োল্লাস করে কোটি ক্রিকেটভক্তরা।বাংলাদেশ-বাংলাদেশ’বলে সেই গর্জন বাংলাদেশ ছাড়িয়ে যেন বিশ্বকে জানান দেয়, ‘ক্রিকেট মানেই বাংলাদেশ, বাংলাদেশ মানেই বিশ্বজয়!’
বাংলাদেশের আগে যে ৩টি দল শততম ম্যাচে জয় পেয়েছিল প্রত্যেকেই জিতেছিল রান ব্যবধানে। ১৯১২ সালে অস্ট্রেলিয়া দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়েছিল ইনিংস ও ৮৮ রানে। ১৯৬৫ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছিল ১৭৯ রানে। শেষ দল হিসেবে শততম টেস্ট জেতা পাকিস্তান অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছিল ৭১ রানে। বাংলাদেশই একমাত্র দল যারা লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে জয় পেয়েছে শততম টেস্টে।

 

টস জিতে পি. সারা ওভালে শ্রীলঙ্কা প্রথম ইনিংসে করে ৩৩৮ রান। জবাবে ১২৯ রানের লিডসহ বাংলাদেশের পুঁজি ৪৬৭ রান। পিছিয়ে থেকে ব্যাটিংয়ে নেমে বাংলাদেশের লিড টপকে শ্রীলঙ্কা ৩১৯ রান সংগ্রহ করে। ইতিহাস গড়ার জন্য বাংলাদেশ লক্ষ্য মাত্র ১৯১ রানের। ৭৪ ওভারে এ রান করতে হত বাংলাদেশকে।৬ উইকেট হারিয়ে লক্ষ্য ছুঁয়ে ফেলে টেস্ট ক্রিকেটের নতুন পরাশক্তিরা। বিদেশের মাটিতে এটি বাংলাদেশের চতুর্থটেস্ট জয়। এর আগে জিম্বাবুয়ের মাটিতে একটি এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে দুটি টেস্টে জয় পায় বাংলাদেশ। এ জয়ে জয়বাংলা কাপ সিরিজ ১-১ ব্যবধানে ড্র করেছে বাংলাদেশ। পি. সারায় সর্বোচ্চ ২৪৪ রান ডিফেন্ড করার রেকর্ড শ্রীলঙ্কার। সেখানে এবারের লক্ষ্য ১৯১। স্বল্প পুঁজি নিয়েও জ্বলে উঠল শ্রীলঙ্কা। ২২ রানে তুলে নেয় ২ উইকেট। সৌম্য সরকার হেরাথের বলে এগিয়ে এসে মারতে গিয়ে ক্যাচ দেন লং অফে। পরের বলেই ইমরুল কায়েস ক্যাচ দেন স্লিপে। পুরো চাপে বাংলাদেশ। সেখান থেকে তৃতীয় উইকেটে সাব্বির রহমানকে নিয়ে জুটি বাঁধেন। ১০৯ রান করেন তারা। মধ্যাহ্ন বিরতির আগে তাদের দুজনের পথ চলা শুরু হয়। তাদের পথ আটকে যায় চা-বিরতির ঠিক আগে। দায়িত্বশীল ইনিংস খেলছিলেন তামিম ইকবাল। কিন্তু হঠ্যাৎই মেজাজ হারিয়ে নিজের উইকেট বিলিয়ে আসলেন। ৮২ রানে তামিমের উইকেট নেন দিলরুয়ান পেরেরা। আউট হওয়ার আগে ১২৫ বলে ৭ চার ও ১ ছক্কায় নিজের ইনিংসটি সাজান দেশসেরা ওপেনার। তামিমের বিদায়ের পর সাব্বিরও একই পথে হাঁটেন। পেরেরার বলে সুইপ করতে গিয়ে বল মিস করেন সাব্বির। শ্রীলঙ্কার আবেদনে শুরুতে সাড়া দেননি আম্পায়ার রবী। কিন্তু রিভিউ নিয়ে সাব্বিরের উইকেট তুলে নেয় শ্রীলঙ্কা।

চা-বিরতির আগ পর্যন্ত আর কোনো উইকেট হারায়নি বাংলাদেশ। বিরতির পর ৩৫ রানের প্রয়োজনে ব্যাটিংয়ে নামেন সাকিব আল হাসানও মুশফিকুর রহিম। স্কোরবোর্ডে ৬ রান যোগ হতেই সাকিব বোল্ড আউট হয়ে সাজঘরের পথ ধরেন। ষষ্ঠ উইকেটে মুশফিককে সঙ্গ দেন মোসাদ্দেক হোসেন। দুজন দলকে জয়ের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যান। জয়ের থেকে ২ রান দূরে থেকে মোসাদ্দেক আউট হয়ে গেলেও মুশফিক দলকে জিতিয়ে মাঠ ছাড়েন। মুশফিকুর রহিম ২২ ও মিরাজ ২ রানে অপরাজিত থেকে ঐতিহাসিক জয় তুলে নেন।

 

এর আগে পঞ্চম দিন মাত্র ৫৬ মিনিট ফিল্ডিং করে বাংলাদেশ। গতকালের দুই অপরাজিত ব্যাটসম্যান দিনের শুরুতে খানিকটা আগ্রাসন দেখালেও সময় গড়ানো সাথে সাথে স্বরূপে ফিরে টাইগাররা। মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিংয়ে এসে বাংলাদেশকে উল্লাসে ভাসান। অবশ্য বোলিংয়ে উইকেট পাননি তিনি। রান আউটে শ্রীলঙ্কান ব্যাটসম্যান দিলরুয়ান পেরেরাকে আউট করেন মিরাজ। শর্ট লেগ থেকে শুভাশীষের থ্রোতে বোলিং এন্ডে বল পান মিরাজ। বল তালুবন্দি করে স্ট্যাম্প ভাঙতে সময় নেননি মিরাজ। ৫০ রান করা দিলরুয়ান ডাইভ দিয়েও নিজের উইকেট বাঁচাতে পারেনি। এর তিন বল পরই সাকিব লঙ্কানদের ইনিংস গুটিয়ে দেন। সাকিবের বল এগিয়ে এসে মারতে গিয়ে লং অফে ক্যাচ দেন ৪২ রান করা লাকমাল। লং অফে মোসাদ্দেকের বল তালুবন্দি করতে কোনো বেগ পেতে হয়নি। ৫১ রান তুলে পঞ্চম দিনে শ্রীলঙ্কার সংগ্রহ দাঁড়ায় ৩১৯। বাংলাদেশ লক্ষ্য পায় ১৯১ রানের। তাতেই ইতিহাস বাংলাদেশ।