বাংলাদেশের ক্রিকেট এবং ক্রীড়ার হালচাল

৫০

১৯৯৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপে কোচ গর্ডন গ্রিনিজের সাথে টিম বাংলাদেশের প্রথম সারির সুপার স্টাররা

মোস্তফা কামাল ত্বহাঃ বাংলাদেশের “ক্রীড়া” নিয়ন্ত্রণ বোর্ড ২৯টি খেলাধূলা সংক্রান্ত ভিন্ন ভিন্ন ফেডারেশন নিয়ন্ত্রণ করে।
“ক্রীড়া” শব্দটি ব্যকরণের আলোকে ছোট্ট একটি শব্দ হলেও এর পারিভাষিক সংজ্ঞায়ন অনির্দিষ্ট। কারন “হাত” এবং “পা” অথবা উভয়ের সাথে সম্পৃক্তের মাধ্যমে বিনোদনের যে মানসিক বহিঃপ্রকাশ ঘটে সেটাই হলো ক্রীড়া।সংজ্ঞায়ন অনির্দিষ্ট হওয়ার কারন হচ্ছে- কারো কাছে যেটা খেলা সেটাই অন্যদের কাছে বিরক্তির কারন! আবার মানসিক দক্ষতা যাচাইও এক প্রকার খেলা-ধুলার অংশ। যেমন- ” ধাঁধা “কেও মাঝে মাঝে আমরা ধাঁধা-খেলা বলি!

সংজ্ঞায়ন যা ই হোক এ কথা স্পষ্ট যে, বাংলাদেশ তথা জাতীয় পর্যায়ে আমরা ক্রিকেট এবং ফুটবলকেই প্রধান খেলা হিসেবে জানি এবং এ নিয়ে নানা তর্ক-বিতর্কে জড়াই।

“খেলা” কে দুটি নির্দিষ্টভাগে ভাগ করা যেতে পারে। ১। উপকরনমুক্ত এবং ২। উপকরনযুক্ত। উপকরণমুক্ত খেলার মধ্যে এক্কাদোক্কা, দাড়িয়াবান্দা, গোল্লাছুট, কানামাছি, বরফ-পানি, বউচি, ছোঁয়াছুঁয়ি ইত্যাদি খেলা উল্লেখযোগ্য। এবং উপকরণযুক্ত খেলার মধ্যে- ফুটবল, ক্রিকেট, নৌকা বাইচ, সাপ-বানরের খেলা, ডাঙ্গুলি, সাতচাড়া, রাম-সাম-যদু-মধু বা চোর-ডাকাত-পুলিশ, মার্বেল খেলা, রিং খেলা ইত্যাদির নাম উল্লেখযোগ্য।
অন্যান্য খেলার মধ্যে হকি, হ্যান্ডবল, সাঁতার, কাবাডি এবং দাবা উল্লেখযোগ্য। এযাবৎ ৫ জন বাংলাদেশী – নিয়াজ মোর্শেদ, জিয়াউর রহমান, রিফাত বিন সাত্তার, আবদুল্লাহ আল রাকিব এবং এনামুল হোসেন রাজীব – দাবায় গ্র্যান্ড মাস্টার খেতাব লাভ করেছেন।

সাঁতার, বাংলাদেশের জাতীয় পর্যায় ছাড়া, জনসাধারনের কাছে আলাদা ক্রীড়া হিসেবে তেমন একটা মর্যাদা পায় না, যেহেতু বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের মানুষকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আবশ্যকীয়ভাবে সাঁতার শিখতে হয়।

শুধু দেশীয় প্রেক্ষাপটেই নয়, পৃথিবীতে ১৯৫ টি স্বাধীন রাষ্ট্রের মধ্যেই ফুটবল, টেনিস এবং ক্রিকেট এই তিনটি খেলাই বিশ্বজুড়ে সমাদৃত এবং জনপ্রিয় খেলা। যার সাথে জড়িয়ে আছে হাসি-কান্না, রাত জাগা স্বপ্ন, আরও একটি নতুন আশা।
তবে আমাদের দেশীয় প্রেক্ষাপটে ক্রিকেট এর জনপ্রিয়তার আশে পাশেও নেই অন্য কোন খেলাধূলা। তাই আমাদের পরবর্তী আংশিক অংশজুড়েই থাকবে শুধুই ক্রিকেট প্রসঙ্গ।

বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের অফিসিয়াল নিকনেম ১৯৭২ সাল থেকেই “বেঙ্গল টাইগার্স”! কিন্তু অভ্যন্তরীণ অথবা বাহ্যিক অথবা হতে পারে উভয় কারনেই ৯০ দশকের পর থেকে ফুটবলকে ছাপিয়ে ক্রিকেট ক্রমান্বয়ে উন্নতি করতে থাকে। দেশের মানুষের হৃদয়ে গেঁথে যায় ক্রিকেট। সেই থেকে দিনে দিনে ক্রিকেট খেলাই হতে থাকে ” টাইগার ” দের খেলা!

১০ নং জার্সিতে ফেনী সকারের অধিনায়ক আকবর হোসেন রিদন

অতীতের ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায় দেখতে পাই- ১৭২৭ সালে “ক্রিকেট” লন্ডন ও দক্ষিণ ইংল্যান্ডের একটি প্রধান ক্রীড়া ছিল। ঐ শতাব্দীতে বাজিকরদের আগ্রহের কারণে ক্রীড়াটিতে প্রচুর অর্থলগ্নি করা হয়। ধনী ব্যক্তিদের অনুদানে ও বিনিয়োগে কাউন্টি দল, পেশাদার খেলোয়াড় এবং প্রথম বড় ক্লাবগুলির আবির্ভাব ঘটে। ১৭২৬ সালে লন্ডন ও ডার্টফোর্ড ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্লাব। কেন্ট, মিডলসেক্স, সারি ও সাসেক্সের কাউন্টি দলগুলি ছিল প্রথম সারির ক্রিকেট দল। আর্টিলারি গ্রাউন্ড, ডার্টফোর্ড ব্রেন্ট, কেনিংটন কমন, মুলজি হার্স্ট এবং রিচমন্ড গ্রিন ছিল তখনকার দিনের সুপরিচিত ক্রিকেট মাঠ।

১৬৯৭ সালের আগে সংবাদপত্রগুলিতে ক্রিকেটের কোন উল্লেখ নেই। কিন্তু ১৭২০-এর দশকের মাঝামাঝি নাগাদ ক্রিকেট-সংক্রান্ত রিপোর্ট বাড়তে থাকে। তবে এই রিপোর্টগুলি বহুদিন যাবৎ পূর্ণাঙ্গ ছিল না। আসল খেলার বিবরণের চেয়ে খেলার সময়সূচি কিংবা খেলার উপর বাজির দর নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনাই ছিল এগুলির মূল বিষয়বস্তু।

ক্রিকেটে বাংলাদেশের উত্থান চমক জাগানোর মতো। আমাদের অন্তরে গেঁথে আছে ক্রিকেটের প্রতি আজন্ম ভালোবাসা । তাই ক্রিকেটারগণ কাঁদলে আমাদের চোখের পানিও ঝরতে থাকে ঝর্ণা ধারায়। তবুও স্বপ্ন বুনি আরও একটি পাক-ভারত বধের।
.
১৯৯৭ সালে বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেট দল আইসিসি ট্রফি জয় করে, যার ফলে ১৯৯৯ সালে প্রথমবারের মতো আমরা বিশ্বকাপ ক্রিকেটে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাই। প্রথম পর্বেই বাংলাদেশ স্কটল্যান্ড ও পাকিস্তান ক্রিকেট দলকে পরাজিত করি। এছাড়া ২০০০ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল টেস্ট ক্রিকেট খেলার মর্যাদা লাভ করে।

ক্রিকেট দলের মধ্যে ধারাবাহিক সাফল্যের অভাব থাকলেও তাঁরা বিশ্বের প্রধান ক্রিকেট দলগুলোকে, যেমন: অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তান, দক্ষিন আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড, ভারত, শ্রীলংকা, ইংল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, জিম্বাবুয়ে, আফগানিস্তান, আয়ারল্যান্ড, আরব আমিরাত, কেনিয়া, কানাডাসহ প্রভৃতি ক্রিকেট দলগুলোকে হারিয়ে এসেছে। রয়েছে প্রতাপশালী দলগুলোকে “বাংলা ওয়াশ” করার কৃতিত্ব।

২০০৭ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপে বাংলাদেশ অতি গুরুত্বপূর্ণ দুটি দল ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে এবং ২০১৫ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে নাটকীয়ভাবে পরাজিত করে বিশ্বক্রিকেটে বিশেষ আলোচনার ঝড় তোলে।
টেস্ট ক্রিকেট খেলার মর্যাদা লাভ করার পর এপর্যন্ত বাংলাদেশ তিনটি টেস্ট সিরিজ জয় করেছে। প্রথমটি জিম্বাবুয়ের সাথে ২০০৪-‘০৫ খ্রিস্টাব্দে, দ্বিতীয়টি জুলাই ২০০৯-এ ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপরীতে এবং তৃতীয়টি ২০১৪ সালের নভেম্বর মাসে জিম্বাবুয়েকে।
২০১৬ এর শেষের দিকে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক টেস্ট জয় তো গোটা ক্রিকেট বিশ্বকেই কাঁপিয়ে দিয়েছে। সেই সাথে মেহেদী মিরাজও সবার অন্তরে সঞ্চার করেছেন নতুন আশা।

বাংলাদেশের খেলোয়াড় সাকিব আল হাসান ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে সব ফরম্যাট ক্রিকেটে বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারের মর্যাদা অর্জন করেন। বাংলাদেশ ২০১১ সালে যৌথভাবে ভারত ও শ্রীলংকার সাথে আইসিসি বিশ্বকাপ ক্রিকেট আয়োজন সফলভাবে সম্পন্ন করেছে।

বর্তমানে আইসিসি রেটিং অনুযায়ী ৭ -এ অবস্থান করলেও শক্তিমত্তায় বাংলাদেশ যে কোন ক্রিকেট দলের সাথে হাড্ডা-হাড্ডি লড়াইয়ের মাধ্যমে জয় ছিনিয়ে আনতে সক্ষম। আমাদের আছে সাকিব, তামিম, মাশরাফি, মুশফিক, রিয়াদ, রুবেল, তাসকিন। নতুন সেনশেসন মুস্তাফিজ তো বিশ্ব ক্রিকেটের বোলিং কিং। আমাদের উন্নতির এ ধারা অব্যাহত থাকলে সেদিন আর বেশী দূরে নয় যেদিন আমরা নিজেদের ঘরে বিশ্বকাপ ট্রফি তুলবো, ইনশা আল্লাহ।

শুধু ক্রিকেটই নয়, সরকার এবং বিভিন্ন বেসরকারী সংস্থার পৃষ্ঠপোষকতাই পারে দেশের সবগুলো ক্রীড়া অঙ্গনকে একটি লাভ জনক এবং বিনোদনের শ্রেষ্ঠ পর্যায়ে নিয়ে যেতে। এ জন্য প্রয়োজন গণমাধ্যমের বলিষ্ঠ ভুমিকা।

[কপি করা থেকে বিরত থাকার জন্য অনুরোধ]