৭২ ঘণ্টার মধ্যে ভেঙে পড়তে পারে হ্রদের বাঁধ

নেপালের সীমান্তবর্তী এলাকায় সৃষ্ট একটি বিশাল প্রাকৃতিক হ্রদ আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ভেঙে ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি করতে পারে বলে জরুরি সতর্কতা জারি করেছে চীন।

দেশটির পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হ্রদটির প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে নিচের দিকে আকস্মিক বন্যা বা জলপ্রবাহের তীব্র স্রোত সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমসের প্রতিবেদনের বরাতে এ তথ্য জানা গেছে।

চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সতর্কতা অনুযায়ী, নেপালের ছোচেন খোলা ও পুরেপু সাংপো নদীর মিলনস্থলের কাছে একটি বিশাল প্রাকৃতিক বাঁধের পেছনে পানি জমে এই হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে।

হ্রদটির পানি উপচে পড়ার পাশাপাশি প্রাকৃতিক বাঁধটি ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকিও দ্রুত বাড়ছে।

হাইড্রোজিওলজিস্ট বা জলভূতত্ত্ববিদদের হিসাব অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত হ্রদটিতে জমে থাকা পানির পরিমাণ প্রায় ২০ লাখ ঘনমিটার। আগামী তিন দিনে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি ওই প্রাকৃতিক বাঁধের দিকে প্রবাহিত হয়ে জমা হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এর ফলে আগামী ৭২ ঘণ্টা পরিস্থিতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চীনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সম্ভাব্য বাঁধভাঙা বন্যার গতিপথ ও প্রভাব নির্ণয়ে রিয়েল-টাইম বন্যা সিমুলেশন চালানো হচ্ছে। এসব সিমুলেশনের মাধ্যমে নিচের দিকে পানির প্রবাহ কীভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে, কোথায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি তৈরি হতে পারে এবং উদ্ধার তৎপরতা কীভাবে পরিচালনা করা হবে—এসব বিষয়ে আগাম ধারণা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।

চায়না সেন্ট্রাল টেলিভিশন (সিসিটিভি) জানিয়েছে, জরুরি উদ্ধার তৎপরতায় সহায়তা করা এবং পরবর্তী পর্যায়ে নতুন করে আকস্মিক বন্যা বা বাঁধভাঙা জলপ্রবাহের ঝুঁকি কমাতেই এই পূর্বাভাস ও সিমুলেশন পরিচালনা করা হচ্ছে।

চীনের এই সতর্কতার মধ্যেই ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের ধাক্কা সামলাচ্ছে নেপাল।

বুধবার ভোতে কোশি নদী করিডোরে হড়কা বান ও ভূমিধসের ঘটনায় দেশটিতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ৩৫৯ জনে দাড়িয়েছে।

নেপাল আর্মি, সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী এবং নেপাল পুলিশের সদস্যরা যৌথভাবে উদ্ধার ও তল্লাশি অভিযান চালাচ্ছেন। এরই মধ্যে নদীর নিম্নাঞ্চল থেকে শত শত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার বিকাল পর্যন্ত শুধু নারায়ণী নদী থেকেই ১২১টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

তবে বিপর্যস্ত হিমালয়সংলগ্ন জেলাগুলোতে রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত শত শত মানুষের কোনও সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।

নিখোঁজদের মধ্যে ৯০০-এর বেশি বিদেশি নাগরিক ও তীর্থযাত্রী রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

চীনের সীমান্তেও ভয়াবহ পরিস্থিতি
দুর্যোগের সূত্রপাত হয় বুধবার। নেপালের ভূখণ্ড থেকে নেমে আসা একটি বিশাল ভূমিধস ও বন্যার স্রোত দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের শিজাং স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের জিরং বন্দর এলাকায় আঘাত হানে।

নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী গুরুত্বপূর্ণ এই এলাকায় বন্যা ও কাদাধসের কারণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

চীনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটির সীমান্তবর্তী এলাকায় রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। আরও দু’জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। তবে ৫৫৮ জন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি উদ্ধারকর্মীদের পাশাপাশি চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) এবং বিভিন্ন ত্রাণ ও উদ্ধারকারী দলকে সীমান্ত এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে।

টানা বৃষ্টি ও দুর্গম ভূখণ্ডে উদ্ধারকাজ ব্যাহত
উদ্ধার ও তল্লাশি কার্যক্রমকে সবচেয়ে বেশি জটিল করে তুলেছে অব্যাহত বৃষ্টিপাত এবং দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ড। হিমালয়সংলগ্ন এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকিও রয়েছে। ফলে উদ্ধারকারী দলগুলোর জন্য দুর্গত এলাকায় পৌঁছানো এবং নিখোঁজদের সন্ধান করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

এর মধ্যেই নতুন করে প্রাকৃতিক হ্রদ ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মতে, আগামী তিন দিন ওই এলাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হ্রদটির পানি ও প্রাকৃতিক বাঁধের ওপর নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি সম্ভাব্য বন্যার গতিপথ নির্ধারণ করে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের প্রাকৃতিক বাঁধ বা ভূমিধসের কারণে তৈরি হ্রদ হঠাৎ ভেঙে গেলে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পানি নিচের দিকে ধেয়ে যেতে পারে। এতে নদীর তীরবর্তী জনবসতি, সড়ক, সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামোতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।

ফলে নেপাল ও চীন—দুই দেশই এখন উদ্ধার তৎপরতার পাশাপাশি নতুন করে সম্ভাব্য বাঁধভাঙা বন্যা মোকাবিলায় প্রস্তুতি জোরদার করছে।

সূত্র: নেপাল নিউজ, কাঠমান্ডু পোস্ট