অরেঞ্জ ঝড়ে কাঁপতে পারে বিশ্বকাপ! ২০২৬-এ নেদারল্যান্ডস কি লিখবে নতুন ইতিহাস?

৫৫
বর্তমান নেদারল্যান্ডস দলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র তাদের ডিফেন্স

মোস্তফা কামাল তোহা | ক্রীড়া প্রতিবেদকঃ বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে দুর্ভাগা পরাশক্তি বলা হয় নেদারল্যান্ডসকে। ১৯৭৪, ১৯৭৮ এবং ২০১০ সাল, এই তিনবার ফাইনালে উঠেও ট্রফি ছুঁতে পারেনি অরেঞ্জ বাহিনী। প্রতিবারই স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে শেষ ধাপে এসে।

 

তবে ২০২৬ বিশ্বকাপকে ঘিরে এবার ভিন্ন এক আবহ তৈরি হয়েছে ডাচ শিবিরে। অনেক বিশ্লেষকই মনে করছেন, দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের সবচেয়ে বড় সুযোগ হয়তো এবারই পেয়েছে নেদারল্যান্ডস।

 

সম্প্রতি কোচ রোনাল্ড কোম্যান ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত দল ঘোষণা করেছেন। সেই দল দেখেই ফুটবলবিশ্বে শুরু হয়েছে আলোচনা। কারণ অনেকদিন পর এমন একটি ডাচ দল দেখা যাচ্ছে যেখানে রক্ষণ, মাঝমাঠ ও আক্রমণ, তিন বিভাগেই রয়েছে মানসম্মত খেলোয়াড় এবং প্রয়োজনীয় গভীরতা।

বর্তমান নেদারল্যান্ডস দলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র তাদের ডিফেন্স। অধিনায়ক ভার্জিল ফন ডাইক এখনো বিশ্বের অন্যতম সেরা সেন্টার-ব্যাক হিসেবে বিবেচিত হন। তার সঙ্গে রয়েছেন নাথান আকে, মিকি ফন ডি ফেন, জোরেল হাটো, ইয়ান পল ফন হেকে এবং জুরিয়েন টিম্বারের মতো দুর্দান্ত গতির ডিফেন্ডাররা। গতির সঙ্গে শারীরিক সক্ষমতা এবং বল কন্ট্রোল, সবকিছু মিলিয়ে এই রক্ষণভাগকে বিশ্বকাপের অন্যতম শক্তিশালী ইউনিট বলা হচ্ছে।

বিশেষ করে টটেনহ্যামের ডিফেন্ডার মিকি ফন ডি ফেনের গতি এবং ফন ডাইকের অভিজ্ঞতা একসঙ্গে প্রতিপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।

ডানপ্রান্তে ডেনজেল ডামফ্রিসের আক্রমণাত্মক ফুটবলও ডাচদের বাড়তি শক্তি দেবে।

নেদারল্যান্ডসের মাঝমাঠ দেখলে বোঝা যায় কেন অনেক বিশ্লেষক তাদের সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়ন হিসেবে দেখছেন। বার্সেলোনার ফ্রেঙ্কি ডি ইয়ং থাকছেন দলের মূল নিয়ন্ত্রক হিসেবে। তার সঙ্গে থাকবেন রায়ান গ্রাভেনবার্খ, তিজানি রেইন্ডার্স, টেউন কুপমাইনার্স, মার্টেন ডি রুন এবং কুইন্টেন টিম্বারের মতো ফুটবলাররা।

বিশেষ করে তিজানি রেইন্ডার্স গত এক বছরে ইউরোপীয় ফুটবলে নিজের অবস্থান শক্ত করেছেন। আক্রমণ ও রক্ষণ, দুই ক্ষেত্রেই তার কার্যকারিতা কোম্যানের পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ডি ইয়ং এবং গ্রাভেনবার্খের বল দখলে রাখার ক্ষমতা আবার বড় দলগুলোর বিপক্ষে নেদারল্যান্ডসকে আলাদা সুবিধা দিতে পারে।

নেদারল্যান্ডসের সবচেয়ে আলোচিত নাম মেমফিস ডিপাই। ৩২ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড এখনো দেশের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। ইনজুরি কাটিয়ে সদ্য দলে ফিরেছেন তিনি। যদিও তার ফিটনেস নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ রয়েছে। কোচ কোম্যান নিজেও বলেছেন, বিশ্বকাপ শুরুর আগে ডিপাইকে নিজের ফিটনেস প্রমাণ করতে হবে।

তবে ডিপাই একা নন। লিভারপুল তারকা কোডি গাকপো বর্তমানে দলের সবচেয়ে ধারাবাহিক আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের একজন। তার সঙ্গে রয়েছেন ডনইয়েল মালেন, নোয়া ল্যাং, ব্রায়ান ব্রবি, ওয়াউট ভেগহর্স্ট এবং ক্রাইসেনসিও সামারভিল।

বিশেষ করে মালেনের সাম্প্রতিক ফর্ম কোম্যানকে স্বস্তি দিচ্ছে। ইতালিতে দুর্দান্ত মৌসুম কাটিয়ে জাতীয় দলে ফিরছেন আত্মবিশ্বাস নিয়ে।

সবকিছু ইতিবাচক হলেও কিছু উদ্বেগ রয়েছে। ইনজুরির কারণে স্কোয়াডে নেই জাভি সিমন্স। তরুণ এই মিডফিল্ডারকে ভবিষ্যৎ ডাচ ফুটবলের অন্যতম বড় তারকা ধরা হয়। তার অনুপস্থিতি সৃজনশীলতার জায়গায় প্রভাব ফেলতে পারে। এছাড়া জেরেমি ফ্রিম্পং এবং স্টেফান ডি ফ্রাইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ও শেষ পর্যন্ত দলে জায়গা পাননি।

রোনাল্ড কোম্যানের কোচিং ক্যারিয়ারে এটিই হতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ টুর্নামেন্ট। তার হাতে এখন এমন একটি স্কোয়াড রয়েছে যেখানে অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের সুন্দর মিশেল দেখা যাচ্ছে। তবে অতীতের নেদারল্যান্ডসও কাগজে-কলমে শক্তিশালী ছিল। শেষ পর্যন্ত তারা ব্যর্থ হয়েছে নকআউট পর্বের চাপ সামলাতে না পেরে। সেই জায়গাটিই এবার কোম্যানকে বদলাতে হবে।

বিশ্বকাপে ফ্রান্স, আর্জেন্টিনা, স্পেন, ইংল্যান্ড, জার্মানি এবং ব্রাজিলের মতো শক্তিশালী দল রয়েছে। তাই নেদারল্যান্ডসকে সরাসরি শিরোপার প্রধান দাবিদার বলা কঠিন।

তবে বর্তমান স্কোয়াডের ভারসাম্য, রক্ষণভাগের দৃঢ়তা এবং মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা বিবেচনায় ডাচদের ‘ডার্ক হর্স’ নয়, বরং সম্ভাব্য শিরোপাপ্রত্যাশী দল হিসেবেই দেখছেন অনেকে।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে অনেকবার স্বপ্ন ভেঙেছে নেদারল্যান্ডসের। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। ভার্জিল ফন ডাইকের নেতৃত্বে, ফ্রেঙ্কি ডি ইয়ংয়ের মস্তিষ্কে এবং গাকপো-ডিপাইদের আক্রমণে হয়তো নতুন ইতিহাস লিখতে পারে অরেঞ্জ বাহিনী।

আর যদি সেটি সত্যি হয়, তাহলে ৫২ বছরের আক্ষেপ মুছে ২০২৬ বিশ্বকাপই হয়ে উঠবে নেদারল্যান্ডস ফুটবলের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায়।

 

 

লেখকঃ মোস্তফা কামাল তোহা, ক্রীড়া ধারাভাষ্যকার ও ক্রীড়া বিশ্লেষক। 
ইমেইলঃ md.mostafakamaltoha@gmail.com