লিবিয়া হয়ে সাগর পথে ইতালি যাত্রায় ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যু, জীবিত উদ্ধার ২৬

৩৪
মৃত কয়েকজনের ছবি

লিবিয়া থেকে ইউরোপে যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে ১৮ বাংলাদেশিসহ ২২ অভিবাসনপ্রত্যাশীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া ২১ বাংলাদেশিসহ ২৬ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।

গ্রিসের উপকূলে একটি রাবারের নৌকায় টানা ছয় দিন সমুদ্রে ভেসে থাকার পর তাদের মৃত্যু হয়। বেঁচে ফেরা যাত্রীরা শনিবার (২৮ মার্চ) গ্রিক কোস্টগার্ডকে এ তথ্য জানিয়েছেন।

শুক্রবার গভীর রাতে গ্রিক কোস্টগার্ড জানায়, ইউরোপীয় সীমান্ত সংস্থার একটি জাহাজ ক্রিট দ্বীপের কাছে ২৬ জনকে জীবিত উদ্ধার করেছে।

উদ্ধারকৃতদের মধ্যে একজন নারী ও একজন নাবালক রয়েছে। পরে কোস্টগার্ড জানায়, জীবিতদের মধ্যে ২১ জন বাংলাদেশি, চারজন দক্ষিণ সুদানের নাগরিক এবং একজন চাদের নাগরিক রয়েছেন। আহত দুজনকে ক্রিটের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

বেঁচে ফেরা ব্যক্তিদের বরাতে জানা গেছে, নৌকাটি ২১ মার্চ পূর্ব লিবিয়ার বন্দরনগরী তোবরুক থেকে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রবেশের অন্যতম পথ হিসেবে এই রুটটি পরিচিত।

 

যাত্রাপথে নৌকাটি দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ে এবং খাবার ও পানির তীব্র সংকটে পড়ে যাত্রীরা ছয় দিন ধরে সমুদ্রে ভাসতে থাকেন।

বেঁচে ফেরা ব্যক্তিদের দাবি, পথে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মরদেহ এক পাচারকারীর নির্দেশে সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়।

এ ঘটনায় গ্রিক কর্তৃপক্ষ দুজন দক্ষিণ সুদানের নাগরিককে গ্রেফতার করেছে, যাদের বয়স ১৯ ও ২২ বছর। তাদের মানব পাচারকারী হিসেবে সন্দেহ করা হচ্ছে। অবৈধভাবে দেশে প্রবেশ এবং অবহেলার কারণে মৃত্যুর অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।

গ্রিক কোস্টগার্ডের এক মুখপাত্র গণমাধ্যমে জানান, যাত্রাপথে নৌকাটি প্রতিকূল আবহাওয়ার মুখে পড়ে। খাবার ও পানির অভাব এবং চরম ক্লান্তিই তাদের মৃত্যুর কারণ হয়ে থাকতে পারে।

জানা গেছে, মৃতদের বেশির ভাগই সিলেট অঞ্চলের বাসিন্দা। মারা যাওয়া ২২ যুবকের মধ্যে ৫ জনের বাড়ি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায়। এর মধ্যে দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের তারপাশা গ্রামের আবু সর্দারের ছেলে মো. নুরুজ্জামান সর্দার ময়না (৩২), মৃত কারী ইসলাম উদ্দীনের ছেলে মো. সাহান এহিয়া (২২), আব্দুল গণির ছেলে মো. সাজিদুর রহমান (২৬), রাজানগর ইউনিয়নের রনারচর গ্রামের মৃত আব্দুল মালেকের ছেলে মুজিবুর রহমান (৪০) ও করিমপুর ইউনিয়নের মাটিয়াপুর গ্রামের মো. আনোয়ার হোসেনের ছেলে মো. তারেক মিয়া (২৩)।

 

মারা যাওয়ার পর তাদের মরদেহ সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে।

আজ বিকেলে এই খবর জানার পর তারাপাশা ও রনারচর গ্রামে মাতম বইছে। বিষয়টি গ্রিস থেকে জানিয়েছেন ওই যুবকদের সঙ্গে থাকা দিরাই উপজেলার তারাপাশা গ্রামের রুহান মিয়া।

দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সনজীব সরকার বলেন, গ্রিস যাওয়ার পথে সাগরে দিরাই উপজেলার চারজন মারা গেছেন। এর মধ্যে তিনজন কুলঞ্জি ইউনিয়নের ও একজন রাজানগর ইউনিয়নের। আমি স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে চারজনের মারা যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছি।

২২ যুবক অনাহারে মারা যাওয়ার পর তাদের সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়ে বলে জানিয়েছেন ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া কিশোরগঞ্জের এক যুবক। ভিডিওতে ওই যুবককে বলতে শোনা যায়, লিবিয়া থেকে সাগরপথে তারা ৪৩ জন রওনা হয়েছিলেন।

তাদেরকে বড় বোটের কথা বলে ছোট হাওয়াই বোটে তুলে দেওয়া হয়। ওই বোটে ৫ জন সুদানের নাগরিক ও অন্য ৩৮ জন বাংলাদেশি ছিলেন। তাদের মধ্যে ১৮ জন মারা গেছেন, যাদের বাড়ি সুনামগঞ্জ-সিলেটে। মারা যাওয়া যুবকদের মরদেহ দুই দিন বোটে রাখা হয়েছিল।

পরে মরদেহ পচে দুর্গন্ধ বের হওয়ায় সকলকে সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। তার কথা বলার এমন একটি ভিডিও আজ সন্ধ্যার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।

গ্রিসে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম) মার্জিয়া সুলতানা জানান, মৃত ও উদ্ধারকৃত বাংলাদেশিদের তথ্য জানতে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।

এদিকে, ২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসেই ইউরোপীয় ইউনিয়নে পৌঁছানোর পথে বাংলাদেশিসহ অভিবাসীদের মৃত্যুর সংখ্যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ভূমধ্যসাগরে ৫৫৯ জনের মৃত্যু হয়েছে, যেখানে ২০২৫ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ২৮৭।

এর আগে, গত ডিসেম্বরেও ক্রিটের দক্ষিণ-পশ্চিমে ডুবন্ত একটি নৌকা থেকে ১৭ জন অভিবাসীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

সে সময় মাত্র দুজনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল এবং আরও ১৫ জন নিখোঁজ অবস্থায় ডুবে মারা গেছেন বলে ধারণা করা হয়। তাদের মরদেহ আর উদ্ধার করা যায়নি।