কালোমেঘে ছেয়ে গেছে ফরিদপুর-১ নির্বাচনি আসন!

৫৫৩

ফকির মোহাম্মদ ইব্রাহীম, ফরিদপুরঃ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গত ৩ নভেম্বর ২৩৭টি আসনে প্রাথমিক প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করেছে। তবে বাকি ৬৩টি আসনের মধ্যে কতগুলোতে বিএনপি’র প্রার্থী দেওয়া হবে এবং কতগুলো শরীকদের ছেড়ে দেওয়া হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট করে কিছু জানানো হয়নি।

ঘোষিত ২৩৭টি আসনের মধ্যে ফরিদপুরের ৩টি আসনের প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে।কিন্তু ফরিদপুর-১ আসন থেকে বিএনপি’র এখনো কোনো প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়নি। এ আসনটি মিত্রদের ছেড়ে দেওয়া হবে কি-না তাও স্পষ্ট নয়। ফরিদপুর-১ আসন বোয়ালমারী, মধুখালী ও আলফাডাঙ্গা উপজেলা নিয়ে গঠিত। এই নির্বাচনী এলাকায় বিএনপির দুটি গ্রুপ সক্রিয়। এক গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় কৃষক দলের সহসভাপতি খন্দকার নাসিরুল ইসলাম। অপর গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সাবেক ছাত্রনেতা ও ফরিদপুর-১ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী সাবেক ভিপি সামসুদ্দিন মিয়া ঝুনু।

গত ২৩ অক্টোবর ফরিদপুরের বোয়ালমারী, মধুখালী ও আলফাডাঙ্গার উপজেলা ও পৌর বিএনপির ছয়টি সাংগঠনিক কমিটির অনুমোদন দিয়েছে জেলা বিএনপি। জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সৈয়দ মোদাররেস আলী ইছা ও সদস্য সচিব এ কে এম কিবরিয়া স্বপনের স্বাক্ষরে ওই ছয়টি কমিটি ঘোষণা করা হয়। ওই কমিটিগুলোতে খন্দকার নাসিরের অনুসারীদের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল।

এ সময় খন্দকার নাসিরের নেতাকর্মীরা এটাও প্রচার করে যে, এই কমিটি দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান কর্তৃক সরাসরি নির্দেশিত। এজন্য সকলে অনুমান করে নিয়েছিলো, ফরিদপুর-১ আসন থেকে সাবেক এমপি খন্দকার নাসিরের দলীয় প্রার্থীতা এক রকম চূড়ান্ত।

বিএনপি গত ৩ নভেম্বর সারাদেশের ২৩৭টি আসনে প্রাথমিক প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করেছে। কিন্তু ঘোষিত প্রাথমিক প্রার্থী তালিকায় ফরিদপুর-১ আসনের কেউ নেই। এরপর থেকে ফরিদপুর-১ নির্বাচনী এলাকায় সকালে এক গুঞ্জনতো বিকেলে আর এক।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এনিয়ে চলছে বিশ্লেষণ। এসব গুঞ্জনের মধ্যে সাবেক এমপি খন্দকার নাসিরুল ইসলাম,সামসুদ্দিন মিয়া ঝুনু,‘ঢাকা টাইমস’ সম্পাদক আরিফুর রহমান দোলন, সাবেক এমপি শাহ মো. আবু জাফর, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের সাবেক শিক্ষক জামায়াতে ইসলামীর ড. ইলিয়াস মোল্লা, সাবেক এমপি ব্যারিস্টার সৈয়দ কামরুল ইসলাম মোহাম্মদ সালেহউদ্দিনের পুত্র বাংলাদেশ জাস্টিস পার্টি চেয়ারম্যান ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক শিক্ষক এডভোকেট ড. সৈয়দ জাভেদ মোহাম্মদ সালেহউদ্দিন অন্যতম।

খন্দকার নাসিরের অনুসারীদের মতে, তাদের নেতাকেই শেষ পর্যন্ত দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হবে। আন্দালিব রহমান পার্থর দল বাংলাদেশ জাতীয় পার্টিকে (বিজেপি) ফরিদপুর-১ আসন বিএনপি পক্ষ থেকে ছেড়ে দেবে বলে গুঞ্জন উঠেছে। আর সেক্ষেত্রে আরিফুর রহমান দোলন বিজেপিতে যোগ দিয়ে এই আসন থেকে নির্বাচন করবেন। আবার কেউ কেউ ধরনা করছেন, ডিগবাজিবাজ বলে এলাকায় পরিচিত চারবারের সাবেক এমপি শাহ মো. আবু জাফর পুনরায় বিএনপিতে যোগ দিয়ে প্রার্থী হবেন। কেউ আবার বলছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সঙ্গে বিএনপির সমঝোতা হলে খেলাফত মজলিসকে বিএনপি এই আসন দিতে পারে। সেক্ষেত্রে খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মুফতি শারাফাত হুসাইন প্রার্থী হতে পারেন।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ড. ইলিয়াস মোল্লা এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন, তবে এক্ষেত্রে যদি তিনি আওয়ামী লীগের ভোটব্যাঙ্ক কাছে টানতে পারেন তবে জামায়াতের পক্ষে প্রথমবারের মতো এই আসনটি চলে আসতে পারে। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি
ফরিদপুর-১ (মধুখালী – বোয়ালমারী আসন ঘিরে এক নতুন সমীকরনের গুঞ্জন শুরু হয়েছে- সাধারণ মানুষের পছন্দের প্রার্থী হিসাবে ফরিদপুরের কিংবদন্তি সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যারিস্টার সৈয়দ কামরুল ইসলাম মোহাম্মদ সালেহউদ্দিন পুত্র, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক শিক্ষক এডভোকেট ড. সৈয়দ জাভেদ মোহাম্মদ সালেহউদ্দিনের নাম সামনে চলে এসেছে।

 

ফরিদপুরের প্রবাদপ্রতিম রাজনীতিক ব্যারিস্টার সৈয়দ কামরুল ইসলাম মোহাম্মদ সালেহউদ্দিন যিনি ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগ প্রার্থী হিসাবে পাকিস্তানি মন্ত্রীকে পরাজিত করে এমএনএ,১৯৭২ সালে গণপরিষদ সদস্য,১৯৭৩ সালে স্বতন্ত্র এমপি নির্বাচিত হন।তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট গঠনে সহায়তা করেন। ১৯৮১ সালে তিনি বাংলাদেশ জাস্টিস পার্টি প্রতিষ্ঠা করে ১২ দলীয় ঐক্যজোটের শরিকদল হিসেবে স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে অংশ নেন। ১৯৮৩ সালে তার মৃত্যু পরবর্তী সময় দলটি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ছিল।

বিগত আওয়ামী সরকারের সময় বিএনপি বাংলাদেশ জাস্টিস পার্টি ১২ দলীয় ঐক্য জোটে থেকে বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেয়। সম্প্রতি বিএনপির প্রার্থী ঘোষনায় ফরিদপুর ১ নির্বাচনী এলাকা স্থগিত কাউকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা না দেয়ায় এবং বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে একসময় ১২ দলীয় জোটভুক্ত বাংলাদেশ জাস্টিস পার্টি চেয়ারম্যান এডভোকেট ড. সৈয়দ জাভেদ মোহাম্মদ সালেহউদ্দিনের নাম সামনে চলে আসে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ফরিদপুর-১ আসনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভক্তির কারণে সারাদেশে বিএনপির ভাবমূর্তি চরমভাবে নস্যাৎ হবার ফলে সৎ, নিরপেক্ষ, রাজনৈতিক প্রভাবশালী পরিবারের প্রার্থী হিসেবে ড. সৈয়দ জাভেদ সালেহউদ্দিনের নাম সামনে এগিয়ে এসেছে।

নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় বিএনপি নেতারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে তারা একজন গ্রহণযোগ্য ও শিক্ষিত প্রার্থী খুঁজছিলেন, যিনি ঐক্যবদ্ধভাবে নেতৃত্ব দিতে পারেন।তাদের মতে, ড. জাভেদ সালেহউদ্দিন সেই যোগ্যতা ও ঐতিহ্যের প্রতীক। দলের শীর্ষপর্যায়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, স্থানীয় রাজনীতিতে এখন আলোচনা চলছে, তিনি যদি বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পান, তাহলে ফরিদপুর-১ আসনের ভোটের সমীকরণ পাল্টে যেতে পারে।

কারণ, এলাকার রাজনৈতিক, সামাজিক এবং শিক্ষাবান্ধব মহলে তার গ্রহণযোগ্যতা ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। বিএনপির স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও এনসিপি ইতোমধ্যে তার সাথে যোগাযোগ করছেন। তাছাড়া বিগত আওয়ামী লীগ সমর্থক ভোটার, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় তাদের জন্য নিরাপদ প্রার্থী হিসাবে তাকে বিবেচনা করছেন।
ফরিদপুর-১ নির্বাচনী এলাকা তথা বোয়ালমারী, আলফাডাঙ্গা ও মধুখালিতে বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রয়েছে দলটির সকল কর্মী-সমর্থকেরা।