ক্ষমতার চেয়ে বড় পরীক্ষা এখন শাসনের: বিএনপি, জামায়াত ও বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ

মতামত | মোস্তফা কামাল তোহা: বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন উত্তাপের উৎস শুধু সংসদ কিংবা রাজপথ নয়; মানুষের দৈনন্দিন জীবনও হয়ে উঠছে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্র। বাজারদর, জ্বালানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ, আইনশৃঙ্খলা, চাঁদাবাজি, মব-সহিংসতাসহ প্রতিটি ইস্যুই এখন সরকারের সক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রথম ছয় মাসে কিছু অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার দাবি করেছে। কিন্তু একই সময়ে আইনশৃঙ্খলা, জ্বালানি, প্রশাসনে দলীয় প্রভাব এবং বিভিন্ন মন্ত্রীকে ঘিরে বিতর্ক নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও এসবকে সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

অন্যদিকে সংসদ ও রাজপথ, দুই জায়গাতেই সরকারের ওপর চাপ বাড়ানোর রাজনৈতিক কৌশল নিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। জ্বালানি, দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা, হত্যা, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি ও সংস্কারের মতো বিষয়কে তারা রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে সামনে আনছে।

এখানেই বিএনপির সামনে মূল প্রশ্নটি দাঁড়ায়, জামায়াতকে কীভাবে মোকাবিলা করবে সরকার? আমার দৃষ্টিতে, এর উত্তর রাজনৈতিক পাল্টা স্লোগানে নয়। উত্তর দিতে হবে সুশাসন, দক্ষতা, প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ এবং মানুষের জীবনে দৃশ্যমান স্বস্তি এনে।

রাজনীতিতে বিরোধী দলকে মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো বিরোধী দলের বক্তব্য কেড়ে নেওয়া নয়। বরং যে সমস্যাগুলোকে কেন্দ্র করে তারা সরকারের সমালোচনা করছে, সেই সমস্যাগুলোর সমাধান করা।

জ্বালানি সংকটের কথাই ধরা যাক। ২০২৬ সালের আগস্টে গ্যাস সংকটের কারণে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ঘাটতি তৈরি হয়। একপর্যায়ে সর্বোচ্চ লোডশেডিং ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট পর্যন্ত ওঠার তথ্য সামনে আসে।

এরপর মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থেকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ের চাপ বাড়ায় সেপ্টেম্বরেও বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়াতে হয়েছে। ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৪০ টাকা থেকে ১৬০ টাকা করা হয়।

এখানে সরকারের জন্য রাজনৈতিক বাস্তবতা খুব স্পষ্ট। মানুষ আন্তর্জাতিক বাজারের সব হিসাব জানবে না, জানতেও হবে না। তারা জানতে চাইবে, বিদ্যুৎ আছে কি না, গ্যাস আছে কি না, গাড়ির ভাড়া বাড়ছে কি না, পণ্যের দাম কত এবং সংসারের ব্যয় কতটা বেড়েছে।

সুতরাং সরকারের উচিত প্রতিটি মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে শুধু সিদ্ধান্ত ঘোষণা না করে জনগণের সামনে একটি স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দেওয়া। কেন দাম বাড়ল, আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব কতটা, সরকারের লোকসান কত, ভর্তুকি কত, অপচয় কোথায় এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে জনগণ কী সুবিধা পাবে। স্বচ্ছতা এখানে রাজনৈতিক দুর্বলতা নয়, বরং রাজনৈতিক শক্তি।

সরকারের জন্য আরেকটি বড় পরীক্ষা আইনশৃঙ্খলা। সম্প্রতি বিভিন্ন প্রতিবেদনে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখল, সংঘর্ষসহ নানা অভিযোগ উঠে এসেছে। ওধিকার-এর এপ্রিল-জুন ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে ৫৭টি বিএনপি-অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, এসব সংঘাতের পেছনে চাঁদাবাজি, এলাকার নিয়ন্ত্রণ, মাটি বিক্রি এবং রাজনৈতিক কর্মসূচিসহ বিভিন্ন কারণের কথা বলা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অপরাধের অভিযোগও নথিভুক্ত করা হয়েছে। এগুলো অভিযোগ ও প্রতিবেদনের তথ্য- প্রত্যেক ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

আরেকটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে দ্য ডেইলি স্টার ঢাকায় প্রায় ১,২০০ চাঁদাবাজের একটি তালিকার কথা জানিয়েছে এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগও প্রকাশ করেছে।

এখানে বিএনপি সরকারের সামনে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের জায়গা রয়েছে। দলীয় পরিচয় অপরাধের ঢাল হবে, নাকি দলীয় পরিচয় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে আইনের শাসন কার্যকর হবে? সরকার যদি দ্বিতীয় পথটি বেছে নেয়, তাহলে সেটিই হতে পারে তাদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সম্পদ।

কারণ একজন ব্যবসায়ী যদি মনে করেন দোকান চালাতে তাকে রাজনৈতিক পরিচয়ের কাউকে টাকা দিতে হবে, একজন সাধারণ মানুষ যদি মনে করেন থানায় গেলে রাজনৈতিক পরিচয় তার ন্যায়বিচারের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তাহলে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা দুর্বল হয়।

সরকারের উচিত চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে দলীয়ভাবে নয়, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া। অভিযোগের তদন্ত হবে, প্রমাণ হবে, মামলা হবে এবং আদালতের প্রক্রিয়ায় বিচার হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তি ক্ষমতাসীন দলের হোক কিংবা বিরোধী দলের, আইনের মানদণ্ড একই থাকতে হবে।

মব বা জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ার প্রবণতা আরও ভয়ংকর। অধিকারের হিসাবে এপ্রিল থেকে জুন, মাত্র তিন মাসে মব হামলায় ৩৩ জন নিহত হয়েছে। একই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় ৪১ জন নিহত ও ৯৭০ জন আহত হওয়ার কথাও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে সরকার যদি শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত থাকে, কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সংস্কৃতি ঠেকাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি হবে রাষ্ট্রের।

কারণ মব-সহিংসতা কোনো দলের একক সমস্যা নয়। আজ যে জনতা অন্যের বিরুদ্ধে আইন হাতে তুলে নিচ্ছে, কাল সেই একই সংস্কৃতি অন্য কারও বিরুদ্ধে ব্যবহার হতে পারে।

তাই বিএনপি সরকারের সবচেয়ে জরুরি কাজগুলোর একটি হওয়া উচিত, আইনের বাইরে কোনো বিচার নয়।

জামায়াতে ইসলামী এখন বিএনপি সরকারের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। তারা গ্যাস, বিদ্যুৎ, জ্বালানি মূল্য, দ্রব্যমূল্য ও আইনশৃঙ্খলাকে কেন্দ্র করে সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চাপ তৈরি করছে। জুনে জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদেও তারা কর্মসূচি পালন করেছে। এখানে বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় ভুল হবে, জামায়াতের প্রতিটি রাজনৈতিক বক্তব্যকে শুধু রাজনৈতিক বিরুদ্ধাচারণ হিসেবে দেখা।

বরং সরকারকে প্রশ্ন করতে হবে, জামায়াত যে প্রশ্নটি তুলছে, সেটির উত্তর সরকারের কাছে আছে কি না? যদি প্রশ্ন হয় বিদ্যুতের, সরকারকে বিদ্যুৎ দিতে হবে। প্রশ্ন যদি হয় চাঁদাবাজির, সরকারকে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। প্রশ্ন যদি হয় দ্রব্যমূল্যের, সরকারকে বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর হতে হবে। প্রশ্ন যদি হয় প্রশাসনের নিরপেক্ষতার, সরকারকে প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখার প্রমাণ দিতে হবে।

আর যদি জামায়াত কোনো নীতি বা রাজনৈতিক অবস্থান নেয়, বিএনপির উচিত তার জবাব দেওয়া তথ্য, যুক্তি, বিকল্প নীতি ও ব্যাপক রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে।

একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে প্রশাসনিক শক্তি দিয়ে দুর্বল করার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত উল্টো ফল দিতে পারে। বিএনপির জন্য আসল লড়াই জামায়াতের সঙ্গে নয়, নিজেদের শাসনক্ষমতার সঙ্গে।

রাজনীতির একটি অদ্ভুত নিয়ম আছে, সরকার যত দুর্বল হয়, বিরোধী দল তত শক্তিশালী মনে হয়।

জামায়াতের রাজনৈতিক উত্থানকে শুধু জামায়াতের সাংগঠনিক দক্ষতা দিয়ে ব্যাখ্যা করলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। বিরোধী দলের উত্থানের পেছনে ক্ষমতাসীন দলের ব্যর্থতাও অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

অর্থাৎ বিএনপি যদি আইনশৃঙ্খলা ঠিক রাখতে পারে, চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, বিদ্যুৎ-গ্যাসের সংকট মোকাবিলা করতে পারে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে এবং প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখতে পারে, তাহলে জামায়াতের রাজনৈতিক সমালোচনার জায়গা স্বাভাবিকভাবেই সংকুচিত হবে।

অন্যদিকে এসব জায়গায় ব্যর্থতা থাকলে জামায়াতসহ যেকোনো বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি সেই শূন্যস্থান কাজে লাগাবে।

তাহলে কী করতে হবে? আমার মতে, বিএনপি সরকারের সামনে অন্তত পাঁচটি অগ্রাধিকার থাকা উচিত।

এক. চাঁদাবাজি ও দখলের বিরুদ্ধে দলীয় শুদ্ধি নয়, রাষ্ট্রীয় আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

দুই. বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদি জরুরি পরিকল্পনার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনা প্রকাশ করা।

তিন. জ্বালানি বা বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর আগে ও পরে জনগণকে হিসাব দেওয়া- কেন বাড়ল, কোথায় অর্থ যাচ্ছে এবং সংকট মোকাবিলায় সরকারের পরিকল্পনা কী।

চার. প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা।

পাঁচ. জামায়াতসহ বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক বক্তব্যের জবাব রাজনৈতিক ও নীতিগতভাবে দেওয়া। বিরোধী কণ্ঠকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা যেতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের যন্ত্রে পরিণত করা উচিত নয়।

বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে শুধু ক্ষমতায় আসা যথেষ্ট নয়, ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিই হয়ে উঠছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

জামায়াত যদি নিজেদের সংগঠন, আদর্শ ও রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে মানুষের কাছে যেতে চায়, তাদের রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো মানুষের সামনে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক বিকল্প হাজির করা।

আর বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা জামায়াত নয়। সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো, ক্ষমতার সঙ্গে দায়িত্বের ভারসাম্য তারা কতটা রক্ষা করতে পারে। কারণ একটি সরকারকে বিরোধী দল দুর্বল করে না, অনেক সময় সরকারের নিজের ভুলই বিরোধী দলকে শক্তিশালী করে।

আজ মানুষ যদি নিরাপদে ব্যবসা করতে পারে, রাস্তায় চাঁদাবাজির ভয় না থাকে, ঘরে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ থাকে, কারখানায় গ্যাস থাকে এবং বাজারে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও সরকারের প্রতি আস্থা তৈরির ভিত্তি শক্ত হবে।

আর যদি এসব মৌলিক প্রশ্নের উত্তর না মেলে, তাহলে রাজপথে যত রাজনৈতিক ব্যাখ্যাই দেওয়া হোক, মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার কাছে সেসব ব্যাখ্যা খুব বেশি দূর যাবে না।

বাংলাদেশের রাজনীতির আগামী দিনের সবচেয়ে বড় লড়াই তাই শুধু বিএনপি বনাম জামায়াত নয়, বরং কে জনগণের কাছে বেশি কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য রাষ্ট্র পরিচালনার মডেল হাজির করতে পারে, সেই প্রতিযোগিতা।

 

মতামত । মোস্তফা কামাল তোহা, জ্যেষ্ঠ বার্তা সম্পাদক, আনন্দ টিভি