দুদকের অভিযোগ রাজনৈতিক হয়রানির অংশ: আসিফ মাহমুদ

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা অভিযোগকে রাজনৈতিক হয়রানির অংশ বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও সাবেক যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তিনি দাবি করেন, যে দুটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে, সেগুলোর সঙ্গে তার দায়িত্বকালের সিদ্ধান্তের কোনো সম্পর্ক নেই। একটি আদালতের রায় বাস্তবায়নের ঘটনা এবং অন্যটি তার দায়িত্ব ছাড়ার পরের সরকারের সময়ে হওয়া পদোন্নতিকে কেন্দ্র করে।

বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নথিপত্র তুলে ধরে এসব দাবি করেন আসিফ মাহমুদ।

দুদকের অনুসন্ধান নিয়ে তিনি বলেন, অভিযোগের বিষয়গুলো নিয়ে তিনি ও তার সাবেক সহকর্মীরা সরকারি নথি পর্যালোচনা করেছেন। এতে অভিযোগের সঙ্গে প্রকৃত ঘটনার পার্থক্য পাওয়া গেছে বলে দাবি তার।

দুদকের একটি অভিযোগে ৩৮ জন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব বাতিলের কথা বলা হয়েছে। তাদের চলতি দায়িত্ব বাতিল ও পদায়নের ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। তবে আসিফ মাহমুদের দাবি, ঘটনাটি শুধু ৩৮ জনকে ঘিরে নয়। ২০২১ সালের ২৫ নভেম্বর ১১২ জন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাকে উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। পরে ওই দায়িত্বের বৈধতা নিয়ে মামলা হয়।

তিনি বলেন, প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর মামলাটি নিষ্পত্তি হয়। পরদিন ৯ ডিসেম্বর আদালতের রায় বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ২০২১ সালের ওই আদেশ বাতিল করা হয়।

আসিফ মাহমুদ বলেন, আদালতের রায়ের সময় ১১২ জনের মধ্যে ৩৮ জন তখনও চলতি দায়িত্বে ছিলেন। ফলে তাদের চলতি দায়িত্ব বাতিল করে মূল পদে ফেরানো হয়। তার দাবি, এটি কোনো ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং আদালতের রায় বাস্তবায়নের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া।

তিনি বলেন, মন্ত্রণালয় প্রশাসনিক আপিল ট্রাইব্যুনালের রায় অনুযায়ী ওই আদেশ বাস্তবায়ন করেছে। এখানে ব্যক্তিগতভাবে কারও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ ছিল না।

দুদকের দ্বিতীয় অভিযোগে প্রায় ১৫০ জন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদোন্নতি ও পছন্দের স্থানে পদায়নের জন্য অর্থ লেনদেনের অভিযোগের কথা বলা হয়েছে।

তবে আসিফ মাহমুদ দাবি করেন, অভিযোগে ১৫০ জনের কথা বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে বিভিন্ন সময়ে শূন্য হওয়া ১৮২টি পদে পদোন্নতির প্রক্রিয়া নেওয়া হয়েছিল।

তিনি বলেন, ৩৮ কর্মকর্তাকে আদালতের রায়ের ভিত্তিতে আগের পদে ফেরানোর পর সৃষ্ট শূন্য পদসহ বিভিন্ন সময়ে খালি হওয়া পদগুলো পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জ্যেষ্ঠতার তালিকা তৈরি করে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) কাছে পাঠানো হয়।

আসিফ মাহমুদের দাবি, পিএসসি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চাকরির রেকর্ড, এসিআর, বিভাগীয় মামলা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থাসহ প্রয়োজনীয় বিষয় যাচাই করে সুপারিশ দেয়। সেই সুপারিশের ভিত্তিতেই পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, পিএসসির সুপারিশের বাইরে গিয়ে কাউকে পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। তাহলে এখানে দুর্নীতির অভিযোগ কীভাবে আমার বিরুদ্ধে আসে?

তার দাবি, সংশ্লিষ্ট পদোন্নতি তার সরকারের দায়িত্ব ছাড়ার পর হয়েছে। তিনি ২০২৫ সালের ডিসেম্বর সরকারের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। এরপর ২০২৬ সালের মে মাসে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়া হয়। এ কারণে ওই পদোন্নতির সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন আসিফ মাহমুদ।

তিনি বলেন, আমি যখন দায়িত্বেই নেই, তখন যে পদোন্নতি হয়েছে, সেই পদোন্নতির জন্য আমি কীভাবে টাকা নেব?

আসিফ মাহমুদ বলেন, কোনো পদোন্নতি বা পদায়নে অনিয়ম হয়ে থাকলে যে সময় এবং যে প্রশাসনের সময়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে, সেই প্রক্রিয়া তদন্তের আওতায় আসতে পারে। কিন্তু তাঁর দায়িত্ব ছাড়ার পরের সিদ্ধান্তের দায় তাঁর ওপর চাপানো হচ্ছে।

তিনি বলেন, এই নির্দিষ্ট ঘটনায় যদি অনুসন্ধান করতেই হয়, তাহলে যে সরকারের সময়ে পদোন্নতি হয়েছে, সেই সময়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে অনুসন্ধান হওয়া উচিত। আমার বিরুদ্ধে নয়।

তার দাবি, দুদকের অভিযোগের সঙ্গে সরকারি নথির তথ্য মিলিয়ে দেখলেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে।

দুদকের অনুসন্ধানকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দাবি করে আসিফ মাহমুদ বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। তিনি বলেন, আমরা মনে করছি, এই অনুসন্ধান আসলে অনুসন্ধান নয়। এটি রাজনৈতিকভাবে প্রতিপক্ষকে হয়রানি করার একটি প্রক্রিয়া।

তার অভিযোগ, অতীতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো ও দমন করার কাজে দুদককে ব্যবহার করা হয়েছে। এখন একই ধরনের প্রক্রিয়া আবার শুরু হয়েছে।

আসিফ মাহমুদ বলেন, সরকারের দায়িত্বে থাকার সময় বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে তাকে অনেক বিষয়ে অবস্থান নিতে হয়েছে। এসব সিদ্ধান্তের কারণে প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তির সঙ্গে তার বিরোধ তৈরি হয়ে থাকতে পারে বলেও দাবি করেন তিনি।

তার অভিযোগ, বর্তমানে ক্ষমতার অপব্যবহার করে তাকে ও তার পরিবারকে রাজনৈতিকভাবে হয়রানি এবং মানহানি করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

দুদকের মুখপাত্রের বক্তব্য নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন আসিফ মাহমুদ। এনসিপির এই নেতা দাবি করেন, দুদকের মুখপাত্র তার বিরুদ্ধে করা অভিযোগের ‘প্রাথমিক সত্যতা’ পাওয়া গেছে বলে বক্তব্য দেওয়ার পর বিষয়টি ব্যাপকভাবে সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হয়। পরে ওই বক্তব্য একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে প্রত্যাহার করা হলেও ততক্ষণে তার বিরুদ্ধে জনমনে একটি ধারণা তৈরি হয়ে যায়।

আসিফ মাহমুদ বলেন, তিনি দুদকের মুখপাত্রকে বিষয়টি প্রকাশ্যে পরিষ্কার করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। একই সঙ্গে যেসব সংবাদে তার বিরুদ্ধে অভিযোগকে সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে প্রতিবাদ বা সংশোধনী দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন।

তার দাবি, দুদকের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এ কারণে তিনি আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়ার কথা জানান।

তিনি বলেন, আমার মানহানি হয়ে গেছে। সারা দেশে একটি ন্যারেটিভ তৈরি হয়েছে। পরে বক্তব্য প্রত্যাহার করলেও ইতিমধ্যে যে ক্ষতি হওয়ার, তা হয়ে গেছে।

সংবাদ সম্মেলনে সরকারি আদেশ, আদালতের রায় ও পদোন্নতিসংক্রান্ত বিভিন্ন নথি সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন আসিফ মাহমুদ। তিনি এসব নথি যাচাই করে প্রতিবেদন করার আহ্বান জানান।