পাহাড়সম অভিযোগেও বহাল তবিয়তে বিআরটিএ ইন্সপেক্টর, কর্তাদের চোখে ‘কাঠের চশমা’!

৪৪
বিআরটিএ মেট্রো সার্কেল-৩ এ ফিটনেস বাণিজ্য

জালাল উদ্দিন বাবু | ঢাকাঃ মেট্রো সার্কেল-৩ এর বিআরটিএ ইন্সপেক্টর কায়সার আলমের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ফিটনেস বাণিজ্যের পাহাড়সম অভিযোগ থাকলেও এক অদৃশ্য কারণে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না কর্তৃপক্ষ। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিনিয়ত লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে আনফিট গাড়িগুলোকে ফিটনেস সার্টিফিকেট দেওয়া হচ্ছে, যা এখন ওপেন সিক্রেট। উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের রহস্যজনক নীরবতায় সাধারণ মহলে প্রশ্ন উঠেছে, বিআরটিএ যেন এক জবাবদিহিতাহীন ‘তাসের ঘর’, যেখানে নিয়মের তোয়াক্কা না করে যা ইচ্ছে তাই করা হচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কাফরুল বা সংশ্লিষ্ট মেট্রোরেল স্টেশনের নিচের ফাঁকা জায়গাকে এই চক্রটি আনফিট গাড়ির প্রধান ডাম্পিং ও ডিলিং জোন হিসেবে ব্যবহার করছে। ফিটনেস পরীক্ষা করানোর আগের দিন রাতে বা ভোরে আনফিট গাড়িগুলো এখানে সারিবদ্ধ করে রাখা হয়। এরপর দালালের মাধ্যমে নির্দিষ্ট অংকের টাকা দরদাম নিশ্চিত করার পরই মেলে ফিটনেস ছাড়পত্র।

গত ১৮ মে মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে গোপনে এমন কিছু আনফিট গাড়ি পরিদর্শনে আসেন সহকারী মেকানিক্যাল সালাম। তবে গণমাধ্যমের ক্যামেরা দেখেই তিনি তড়িঘড়ি করে স্থান ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা ত্রুটিপূর্ণ গাড়িগুলোর কোনো নিয়মতান্ত্রিক ফিটনেস পরীক্ষা ছাড়াই ছাড়পত্র দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছিল।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিআরটিএ’র এক কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ঢাকা শহরের বিআরটিএ সার্কেলগুলোতে পোস্টিং পেতে লাখ থেকে কোটি টাকার চুক্তিভিত্তিক লেনদেন হয়। বিশাল অঙ্কের টাকা দিয়ে যারা চেয়ারে বসেন, তাদের অপকর্ম ঢাকতেই ওপর মহলের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা চোখে ‘কাঠের চশমা’ পড়ে থাকেন। এই শক্তিশালী সিন্ডিকেট ভাঙতে বিআরটিএ চেয়ারম্যানের সরাসরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।”

সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক পুলিশের এক কর্মকর্তাও এই বাণিজ্যের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন,
“আমরা সড়কে কীভাবে শৃঙ্খলা আনবো? যে বাস বা ট্রাকগুলোর পেছন দিক একদম ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে, সেগুলোরও ফিটনেস দিচ্ছে বিআরটিএ। আমরা সড়কে এসব ভাঙাচোরা গাড়ি আটক করার পর নথিপত্র চেক করতে গিয়ে অবাক হয়ে দেখি, তাদের সব কাগজ একদম আপ-টু-ডেট! বিআরটিএ কীভাবে এই ভাঙা গাড়িগুলোকে ফিটনেস দেয়, তা আমাদের বোধগম্য নয়।”

ইন্সপেক্টর কায়সার আলমের এই ফিটনেস বাণিজ্যের একটি সুনির্দিষ্ট প্রমাণ গত ১২ মে বিকেলে পাওয়া যায়। সেদিন ‘ঢাকা মেট্রো-ট-১৫-৮১-৪৪’ নম্বরের একটি ট্রাকের ফিটনেস শিডিউল পেপারে চার ধরনের বড় ত্রুটি মার্ক করে সেটির ফিটনেস আটকে দেন ইন্সপেক্টর কায়সার। কিন্তু এর ঠিক ২ ঘণ্টা পর, ২০ হাজার টাকা ঘুষের বিনিময়ে সেই চিহ্নিত ত্রুটিযুক্ত গাড়িটিকেই অলৌকিকভাবে ফিটনেস সার্টিফিকেট দিয়ে দেন তিনি। যার যাবতীয় তথ্য-প্রমাণ ও নথি এই প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে।

সড়ক দুর্ঘটনার জন্য যখন ফিটনেসবিহীন গাড়িকে দায়ী করা হচ্ছে, তখন খোদ বিআরটিএ কর্মকর্তাদের এমন কাণ্ডে আঙুল তুলছেন সাধারণ মানুষ। তারা বলছেন, সঠিক নজরদারি ও সদিচ্ছার অভাবেই সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামছে না।

এই পাহাড়সম অভিযোগ ও নির্দিষ্ট গাড়িকে ঘুষের বিনিময়ে ফিটনেস দেওয়ার বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত ইন্সপেক্টর কায়সার আলম ও বিআরটিএ’র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কেউই গণমাধ্যমের সামনে মুখ খুলতে রাজি হননি।