নিজস্ব প্রতিবেদক: মাদকের হাট হিসেবে পরিচিত জেনেভা ক্যাম্প। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক মন্ত্রী নানকের হাত ধরে ২০০৯ সাল থেকে অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যায় এই বিহারি ক্যাম্পের মাদক ব্যবসা। এরপর ইশতিয়াক, পাচু, তার স্ত্রী ইয়াবা সুন্দরী পাপিয়া ও পচিশ ও মোল্লা আরশাদসহ অনেকে বিভিন্ন সময়ে এই ক্যাম্পের মাদকের সম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করেছেন। শুদ্ধি অভিযানের পর পাপিয়া ও পাচুকে গ্রেপ্তার করা হয়। তখন র‍্যবের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় ওই এলাকার আলোচিত মাদক ব্যবসায়ী পচিশ৷ এছাড়া কোভিড ১৯ এর সময় ভারতে করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এরপর জেনেভা ক্যাম্পের মাদকের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় তরুন যুবকদের হাতে।

৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর নতুন করে করে আলোচনায় আসে জেনেভা ক্যাম্পের মাদক ব্যবসায়ীরা। ক্যাম্পের মধ্যে কয়েকদিন চলে মাদক কারবারি বুনিয়া সোহেল ও চুয়া সেলিমের সমর্থক ও খুচরা ব্যবসায়ীদের ভয়াবহ সংঘর্ষ। এতে ব্যবহার করা হয় থানা থেকে লুট হওয়া অন্ত্র। এসব সংঘর্ষ নিহত হয় বেশ কয়েকজন। ঘটনাগুলোর ভিডিও ফুটেজ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশের পর গ্রেপ্তার করা হয় আলোচিত মাদক ব্যবসায়ী বুনিয়া সোহেল ও চুয়া সেলিমকে। এতো কিছুর পরও থেমে থাকেনি জেনেভা ক্যাম্পের মাদক কারবার।

সোহেল ও সেলিমের গ্রেপ্তারের পর জেনেভা ক্যাম্পের মাদকের সম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় অল্প বয়সী কিশোর ও যুবকদের হাতে৷ বর্তমানে জেনেভা ক্যাম্পের মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে পিচ্চি রাজা, মিঠু, বুনিয়া সোহেলের ভাই টুনটুন, কামরান, তার ভাই সুরজ, বিরানী কামাল, ফর্মা কামরান, রাশিদ, হামজা, আতিক ও গুঞ্জ মনির। জনশ্রুতি রয়েছে পট পরিবর্তনের পর মাদক বিক্রি করেই কোটিপতি হয়েছে জেনেভা ক্যাম্পের ৩ কিশোর। তারা হলেন, কান কামরান, সুরজ, পিচ্চি রাজা ও বুনিয়া সোহেলের ম্যানেজার গুঞ্জ মনির।

পিচ্চি রাজা জেনেভা ক্যাম্পের ২ নং সেক্টরের মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে। গঞ্জু মনির নিয়ন্ত্রণ করেন ৭ নং সেক্টরের মাদক ব্যবসা। পিচ্চি সামিরের মাদক ব্যবসা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পুরো জেনেভা ক্যাম্প জুড়ে। এমনকি ক্যাম্পের বাইরেও বেশ কয়েকটি স্পট রয়েছে তার। আর কান কামরান ও তার ভাই সুরজের মাদক ব্যবসা চলে জেনেভা ক্যাম্পে ‘পাকা ক্যাম্পে।’

এছাড়া জামিনে মুক্ত হয়ে জেনেভা ক্যাম্পে নতুন করে মাদক ব্যবসা শুরু করেছেন ইয়াবা সুন্দরী পাপিয়ার স্বামী পাচু ওরফে নাদিম। পুরোনো মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে সক্রিয় রয়েছে, মোল্লা আরশাদ, তিল্লী সাহিদ, এরফান, মুখজালা ও পাকিস্তানি রাজু সহ অন্তত আরো ৫০ মাদক কারবারি।

সূত্র বলছে, বুনিয়া সোহেল গ্রেপ্তারের পর তার ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে তার ছোট ভাই টুনটুন। তাকে করছে জেনেভা ক্যাম্পের সাবেক চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা নানকের এক সময়ের ঘনিষ্ঠ জিলানীর ছেলে গোলাম রাব্বানী ও তার ভাই এসকে নাসিম।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দা বলেন, বুনিয়া সোহেল ও চুয়া সেলিম গ্রেপ্তারের পর আমরা ভেবেছিলাম মাদক ব্যবসা কমে যাবে। কিন্তু এখন।প্রতিটি অলিতে-গলিতে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি হচ্ছে। মাঝেমধ্যে যৌথ বাহিনী অভিযান পরিচালনা করে। কিন্তু অভিযান শুরু হওয়ার আগেই মাদক ব্যবসায়ীরা পালিয়ে যায়। অভিযানে কিছু খুচরা ব্যবসায়ী ধরা পড়লেও। কদিন পর আবার জামিনে মুক্ত হয়ে যায়।

গত ২৯ সেপ্টেম্বর জেনিভা ক্যাম্পে যৌথ বাহিনীর অভিযানে মাদক কারবারি ‘পিচ্চি রাজা’সহ ৩৫ জন গ্রেপ্তার হয় বলে জানানো যৌথ বাহিনীর পক্ষ থেকে। তবে আমাদের অনুসন্ধান বলছে পিচ্চি রাজা গ্রেপ্তার হয়নি। বরং ক্যাম্পে থেকেই মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে মোহাম্মাদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, মোহাম্মদপুর জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) এ কে এম মেহেদী হাসান বলেন, মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে। অনেক মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করা জয়েছে। জেনেভা ক্যাম্প মাদকমুক্ত করতে হলে পুলিশি অভিযানের পাশাপাশি ক্যাম্পের সাধারণ বাসিন্দাদেরও সচেতন হতে হবে বলে মনে করেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।