জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকঃ জনগণের প্রত্যাশিত সরকার গঠনে নিজেদের মধ্যে ছোট-খাটো সমস্যা দূর করে ইস্পাত কঠিন ঐক্য গড়তে সব রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

মঙ্গলবার রাজধানীর গুলশান-২ এর অল কমিউনিটি ক্লাবে বিকল্পধারা বাংলাদেশ আয়োজিত এক ইফতার মাহফিলে তিনি এ আহ্বান জানান।

মির্জা ফখরুল বলেন, জাতির সামনে আজকে যে সংকট, সে সংকট কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়। এ সংকট আজকে সমগ্র দেশের, সমগ্র জাতির।

‘এ সংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে, তাদের পরাজিত করতে হলে ছোট-খাটো সমস্যাগুলো দূর করে আমাদেরকে একটা ইস্পাত দৃঢ় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। সে ঐক্যের মধ্য দিয়েই আমরা এই ভয়াবহ শক্তিকে পরাজিত করতে পারব, জনগণের শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ প্রতিষ্ঠিত করতে পারব। জনগণ আশান্বিত হবে এবং জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী সত্যিকার অর্থে একটি সরকার প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হব,’ বলেন বিএনপির মহাসচিব।

কারাবন্দি খালেদা জিয়ার প্রসঙ্গ টেনে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আজকেই দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন আবার আপিল বিভাগে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে, স্থগিত করে দেওয়া হয়েছে। এই ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে তাকে গ্রেপ্তারের পর থেকেই। তাকে আটকে রাখার জন্যই এ ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।’

‘দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া নিঃসন্দেহে এ দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম পুরোভাগের নেতা। এই ফোরাম থেকে আমি আবারো তার মুক্তির দাবি জানাচ্ছি।’

৫ বছরের জন্যে জাতীয় সরকার :
বিকল্পধারা বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেন, ‘নির্বাচনের পরে দেশের মানুষকে শান্তি দেওয়ার জন্যে, নিরাপত্তা দেওয়ার জন্যে এবং দেশের অগ্রগতির জন্যে আমরা আগামী ৫ বছরের জন্যে একটি জাতীয় সরকার চাই।’

‘সহিংসতা হবে না, আগুন জ্বালানো হবে না, অন্যায়-অত্যাচার-অবিচার হবে না। কতগুলো ম্যাচুরড ব্রেইন একত্রিত করলে হয়ত ইনশাল্লাহ আমরা বাংলাদেশে আরেক সুযোগ পাব।’

যুক্তফ্রন্ট গঠনের কারণ তুলে ধরে এর আহ্বায়ক বি চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আমরা নিউক্লিয়াস গঠন করেছি, যুক্তফ্রন্ট গঠন করেছি। তার মাধ্যমে আমরা একটা নেতৃত্ব দিতে চাই। যে নেতৃত্বে চরিত্র থাকবে, যে নেতৃত্বে সততা থাকবে এবং যে নেতৃত্বের কথার দাম থাকবে।’

‘আমরা আজকে শক্তির উত্থান চেয়েছি। সেই শক্তির মাধ্যমে আমরা সমস্ত রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে সরকারি দলকে সাবধান করে দিতে পারব- দেশের ভবিষ্যৎ শুধুমাত্র জনগণের হাতে চলে যাবে, আপনারা কিছুই করতে পারবেন না।’

বিরোধী দলকে সমাবেশ করতে না দেওয়া, হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে কারাগারে আটকে রাখা কোনোভাবে সহ্য করা যায় না বলে মন্তব্য করেন বি চৌধুরী।

তিনি বলেন, ‘মামলা করে রাজনীতিকদের হয়রানি করা হচ্ছে। বেগম খালেদা জিয়ার আগেই আমরা বলেছি। যখনই বিচার হয়, বিচারের রায় আসে। সুপ্রিম কোর্ট-হাইকোর্টের রায়কে আপনারা বুড়ো আঙ্গুল দেখান। এর চেয়ে লজ্জার বিষয় কী হতে পারে।’

‘রুল অব ল আছে কি? নির্বাচনী প্রক্রিয়া কীভাবে ট্যাম্পার করে দেখাইয়া দিছেন। ২০১৪ সালে দেখেছি, এবার খুলনাতে দেখলাম। এভাবে চলতে পারে না। দেশের মানুষ কষ্ট পাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘এ থেকে উত্তরণে অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন দিতে হবে। আমরা এটা আদায় করব। সংসদ ভেঙে দিতে হবে ১০০ দিন আগে। নির্বাচনের তামাশা দেখতে চাই না। সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে নির্বাচনে। সাহসী নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে।’

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘সর্বশেষ এই কয়দিন ১১১ জন মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। এটা সত্যি সত্যি একটা মৃত্যুর মিছিল বলতে পারেন এবং সেই মিছিল চলছে, থামছে না। আমরা অনেক অনুনয়-বিনয়, প্রতিবাদ করেছি। আপনার সংসদ সদস্যকে যদি প্রমাণ ছাড়া গ্রেপ্তার করা না যায়, তাহলে এদের নামে অভিযোগ আছে তারও কোনো প্রমাণ নেই, তাহলে এদের গুলি করে মারবেন কেন?’

‘উনারা (সরকার) বলছেন, আমরা যুদ্ধ করছি। নিরস্ত্র মানুষের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীর এরকম প্রকাশ্য ঘোষণা প্রথম পৃথিবীর ইতিহাসে। আমরা যারা এখানে আছি তারা এই হত্যার নিন্দা করি।’

তিনি বলেন, ‘আমি প্রথমে মির্জা ফখরুল আলমগীরের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলতে চাই- জীবন রক্ষার জন্যে, জীবন বাঁচাবার জন্যে সমস্ত মানুষকে এক হতে হবে, এটা ঠিক। ফখরুল ভাই, কথা কিন্তু আমাদের অনেক আছে। কারণ, এই যে লড়াই করব, একদিন একটা ভোট হবে, ভোটের পরে জিতে ব্যাপক ভোট পেয়ে আপনারা সরকার গঠন করবেন। তখন আর আমাদের চিনবেন না, যদি এমন হয়।’

‘আমাদের অতীতে অভিজ্ঞতা ভালো নয়। আপনাকে কষ্ট দেবার জন্য বলছি না, অহেতুক খোঁচাও দিচ্ছি না। শুধু এটিই বলছি, এটা বিবেচনায় রাখবেন। একই সাথে লড়াই করতে চাই। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, কোনো শর্ত ছাড়া বেগম জিয়ার মুক্তি দেওয়া উচিৎ, যদি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চান। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কোনো বিকল্প নাই। এর বিকল্প যা কিছু হবে তা দেশের সর্বনাশ আনবে।’

ইফতার মাহফিলের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব, গণস্বাস্থ্য সংস্থার ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, বিকল্পধারার মহাসচিব আবদুল মান্নান, সহসভাপতি অ্যাডভোকেট শাহ আহমেদ বাদল, যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার ওমর ফারুক বক্তব্য রাখেন।

ইফতারে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহবুবুর রহমান মান্না, জেএসডির আ স ম আবদুর রব, সভাপতি সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন, গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, কল্যাণ পার্টির এম এম আমিনুর রহমান, বিজেপির আবদুল মতিন সউদসহ বিকল্পধারার কেন্দ্রীয় নেতারা অংশ নেন।