নিজস্ব প্রতিবেদক : মায়ের কবরের পাশে ছেলের কবরে চিরনিদ্রায় সমাহিত হলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক।

শনিবার বাদ আসর আর্মি স্টেডিয়ামে জানাজার পর বনানী কবরস্থানে ছেলে শারাফুল হকের কবরে দাফন করা হয় আনিসুল হকের মরদেহ।

আনিসুল হকের শিশুপুত্র শারাফুল হক ২০০২ সালে মৃত্যুবরণ করে। তার কবরের পাশেই রয়েছে প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের মায়ের কবর।

জানাজার আগে ৩টা ১০ মিনিট থেকে জাতীয় পতাকা ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের পতাকা দিয়ে ঢাকা আনিসুল হকের মরদেহ আর্মি স্টেডিয়ামে রাখা হয়। সেখানে সর্বস্তরের মানুষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

প্রথমে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করেন রাষ্ট্রপতির পক্ষে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল সরোয়ার হোসেন এবং প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে তার সামরিক সচিব মিয়া মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীন। এরপর জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর পক্ষে ক্যাপ্টেন মোশতাক আহমেদ পুষ্পস্তবক দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

পরে পর্যায়ক্রমে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। এরপর শ্রদ্ধা জানাতে ঢল নামে সাধারণ মানুষের।

কুলখানি ৬ ডিসেম্বর
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আনিসুল হকের কুলখানি হবে আগামী ৬ ডিসেম্বর বুধবার। এদিন বাদ আসর গুলশানের আজাদ মসজিদে কুলখানি হবে। আর্মি স্টেডিয়ামে মেয়র আনিসুল হকের জানাজার আগে আনিসুল হকের ছেলে নাভিদুল হক এ কথা জানান।

নাভিদুল হক বলেন, আমার বাবা ছিলেন সৌখিন মানুষ। তিনি হাসি-খুশি মানুষ ছিলেন।

দেশবাসীর কাছে বাবার জন্য দোয়া চেয়ে তিনি বলেন, কাজের খাতিরে কেউ যদি আমার বাবার ব্যবহারে দুঃখ পেয়ে থাকেন, তাহলে আপনারা তাকে ক্ষমা করে দিয়েন।

আনিসুল হকের মরদেহ শনিবার দুপুর পৌনে ১টায় লন্ডন থেকে ঢাকায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। বিমানবন্দর থেকে মরদেহ শেষবারের মতো বনানীতে নিজ বাসভবনে নেওয়া হয়।

ছেলেকে বাবার শেষ আদর
আনিসুল হক মারা গেছেন বৃহস্পতিবার। কিন্তু গতকালও তা জানতেন না বাবা শরিফুল হক। তিনি ছিলেন তার ছোট ছেলে বর্তমান সেনাপ্রধান আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হকের বাসায়। শরিফুল হকের শারীরিক অবস্থার কথা চিন্তা করে তাকে জানানো হয়নি। কিন্ত আজ আর না জানিয়ে তো উপায় নেই। কারণ, আজকের পর আর বাস্তবে আনিসুল হকের দেখা মিলবে না। তাই আনিসুল হকের মরদেহ দেশে আনার পর ৯৫ বছর বয়সী বাবা শরিফুল হককে হুইল চেয়ারে করে আনা হয় ছেলের মরদেহ দেখাতে। তিনি ছেলেকে শেষ আদর করেন। মাত্র দুই মিনিট ছিলেন ছেলের পাশে। কথা বলার শক্তি নেই তার। শুধু শোন যায় গোঙানির শব্দ।

আনিসুল হকের বাসায় প্রধানমন্ত্রী
আনিসুল হককে শ্রদ্ধা জানাতে বেলা পৌনে ২টার দিকে তার বাসভবনে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি আনিসুল হকের পরিবারের সদস্যদের শান্ত্বনা দেন ও সমবেদনা জানান। শোকাহত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মরহুমের রুহের মাগফেরাত কামনায় মোনাজাতও করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি প্রায় ৩০ মিনিট অবস্থান করেন আনিসুল হকের বাসভবনে। প্রধানমন্ত্রী পৌঁছানোর পর সেখানে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। আনিসুল হকের স্ত্রী, ছেলে-মেয়েসহ পরিবারের সদস্যরা কান্নায় ভেঙে পড়েন।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, আনিসুল হকের ছোট ভাই সেনাপ্রধান আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হকসহ মন্ত্রিসভার সদস্য ও আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা।

এমন আরেকজন খুঁজে পাওয়া কঠিন : ওবায়দুল কাদের
শনিবার দুপুরে আনিসুল হকের বাসভবনে তার মরদেহ দেখতে গিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘তার (আনিসুল হক) দুচোখ ভরা স্বপ্ন ছিল, স্বপ্ন ছিল ঢাকাকে আধুনিক সিটি হিসেবে গড়ে তোলার। আমাদের অনেক বড় ক্ষতি হলো। বাংলাদেশের অনেক ক্ষতি হয়ে গেল। ব্যক্তিগতভাবে আমিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেলাম। আনিসুল হক ছিলেন এক পিস, এমন আরেকজনকে খুঁজে পাওয়া কঠিন। এটা আমাদের জন্য একটা চ্যালেঞ্জ। তার যে স্বপ্ন সেই স্বপ্ন যেন সত্যি হয়, এ নগরীকে আধুনিক নগরীতে রূপ দিতে, গ্রিন অ্যান্ড ক্লিন সিটির স্বপ্নকে বৃথা যেতে দেব না।’

সব কর্মকাণ্ডে আনিসুল হক ছিলেন যোগ্য : তোফায়েল আহমদ
আনিসুল হকের মরদেহ দেখতে গিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমদ বলেছেন, বিভিন্ন সময় আমি জেলে ছিলাম। তখন তিনি (আনিসুল হক) আমার পরিবারের খোঁজখবর রেখেছেন। সব কর্মকাণ্ডে আনিসুল হক ছিলেন যোগ্য। উপস্থাপনা থেকে ব্যবসা- সব বিষয়ে তার দক্ষতা দেশবাসীকে তিনি দেখিয়ে গেছেন। যখন মেয়র আনিসুল ১৯৯৬ সালে রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে টকশো করতেন, সে সময় আমাদের ডাকা হতো। কতো যে প্রশ্ন তিনি করতেন। এরপর তিনি ব্যবসায়ী হিসেবে তার সফলতা দেখিয়েছেন। ব্যবসায়ীদের সকল সংগঠনে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। তারপর মেয়র হিসেবে যখন দায়িত্ব নিলেন, সে সময় গাড়িতে নিয়ে ঘুরে দেখাতেন আমাকে, কীভাবে কাজ করতেন আনিসুল।’

আমি একা হয়ে গেলাম : সাঈদ খোকন
মেয়র আনিসুল হকের মরদেহ দেখতে গিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, ‘আমি একা হয়ে গেছি। দুজন মিলে আধুনিক ঢাকা গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলাম। এখন জানি না ভবিষ্যতে সে স্বপ্নের কী হবে? আর কেউ আমাকে কখনো বড় ভাইয়ের মতো পরামর্শ দেবে না। বড় ভাই হিসেবে আনিসুল হক সবসময় আমার পাশে ছিলেন। এখন আমার কাছে সবকিছু অন্ধকার মনে হচ্ছে।’

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন মেয়রের একান্ত সচিব এ কে এম মিজানুর রহমান জানান, লন্ডনের স্থানীয় সময় শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টায় আনিসুল হকের মরদেহবাহী ফ্লাইটটি বাংলাদেশের উদ্দেশে ছেড়ে আসে।

গত ২৯ জুলাই ব্যক্তিগত সফরে সপরিবারে যুক্তরাজ্যে যান আনিসুল হক। সেখানে অসুস্থ হয়ে পড়লে ১৩ আগস্ট তাকে লন্ডনের ন্যাশনাল নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তার মস্তিষ্কের প্রদাহজনিত রোগ ‘সেরিব্রাল বাস্কুলাইটিস’ শনাক্ত করেন চিকিৎসকরা। এরপর তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়। অবস্থার উন্নতি ঘটলে গত ৩১ অক্টোবর আইসিইউ থেকে রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে স্থানান্তর করা হয়। গত ২৮ নভেম্বর আবার অবস্থার অবনতি হলে তাকে রিহ্যাবিলিটেশন থেকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় রাত ১০টা ২৩ মিনিটে লন্ডনের ওয়েলিংটন হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

মেয়র আনিসুল হকের মৃত্যুতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ১ থেকে ৩ ডিসেম্বর তিন দিনের শোক পালনের ঘোষণা দিয়েছে। আগামী ৩ ডিসেম্বর রোববার ডিএসসিসি অফিস বন্ধ থাকবে।

আনিসুল হকের জন্ম ১৯৫২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর নোয়াখালী জেলায়। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক সম্পন্ন করেন। ৮০ থেকে ৯০ এর দশকে টেলিভিশন উপস্থাপক হিসেবে তিনি পরিচিতি লাভ করেন। এরপর ব্যবসায়ী থেকে হয়ে ওঠেন রাজনীতিবিদ। তিনি ছিলেন একজন সফল উদ্যোক্তা। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনেরও (এফবিসিসিআই) সভাপতি ছিলেন। ২০১৫ সালের এপ্রিলে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন আনিসুল হক।