
উইকেট পতনের আনন্দ উদযাপন করছে টীম বাংলাদেশ। এমন উদযাপন অব্যাহত রাখতে চান মুমিনুল
ক্রীড়া ডেস্কঃ হতে পারত পুরো দিনটি বাংলাদেশের! কিন্তু হলো না। দক্ষিণ আফ্রিকার ডেরায় প্রথম ইনিংসে বোলিংয়ে না পারলেও নিষ্প্রাণ ও মন্থর উইকেটে ব্যাটিংয়ে লড়ছিল বাংলাদেশ। কিন্তু সেই লড়াই ছিল শুধুমাত্র প্রতিরোধের। ফলে পচেফস্ট্রুম টেস্টে দাপট দেখাতে থাকা দক্ষিণ আফ্রিকা তৃতীয় দিন শেষেও ম্যাচের লাগাম নিজেদের হাতেই রেখেছে।
প্রথম ইনিংসে ছন্দহীন ও বিবর্ণ বোলিংয়ের পর ব্যাটিংয়ে রেণু ছড়িয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু রোমাঞ্চ ছড়াতে পারেননি। সাফল্য পেলেও পারেনি উৎসবে মাততে। থিতু হয়ে ব্যাটসম্যানরা আউট হয়েছেন বাজে বলে! মনোসংযোগের ঘাটতি কিংবা টেস্ট খেলার অনভিজ্ঞতা; ব্যর্থতার ব্যাখ্যা এগুলোই হতে পারে!
ইনিংসে প্রথমবারের মতো তৃতীয়, থেকে ষষ্ঠ উইকেটে পঞ্চাশ রানের জুটি পায় বাংলাদেশ। কিন্তু কোনো জুটি শতরানের মুখ দেখেনি। একটি কিংবা দুটি জুটি বড় হলেই দক্ষিণ আফ্রিকাকে ব্যাট হাতে কড়া জবাব দিতে পারত বাংলাদেশ। কিন্তু সেরকম কিছু হয়নি। পেস স্বর্গে এমন সলিড ব্যাটিং উইকেটে ব্যাটসম্যানদের বড় রান না করার আক্ষেপ থাকবে অনেকটা সময়।
আগের দিনের ১২৭ রানের সঙ্গে আরো ১৯৩ রান যোগ করে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে গুটিয়ে যায় ৩২০ রানে। ১৭৬ রানের লিড নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করে তৃতীয় দিন শেষে ২ উইকেটে ৫৪ রান করেছে দক্ষিণ আফ্রিকা। লিড ২৩০ রানের।
রৌদ্রজ্জ্বল দিনের শুরু থেকেই চাপে ছিল বাংলাদেশ। তামিম দ্বিতীয় বলে বাউন্ডারি মেরে দিনে প্রথম রান নিলেও মুমিনুলের প্রথম রানের জন্য অপেক্ষা করতে হয় ৩০ বল! এর মধ্যে দুবার এলবিডব্লিউর আবেদন করেছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। একবারও সাড়া দেননি আম্পায়ার। তবে দক্ষিণ আফ্রিকা রিভিউ নিলে মুমিনুল প্রথম দফায় ফিরে যেতেন সাজঘরে!
কাগিসো রাবাদার দিনের প্রথম স্পেল ছিল বিধ্বংসী। তামিমকে দুবার রিভিউ নিয়ে আউট করতে চেয়েছিলেন। প্রথম বলটি আউট সাইড অফ দ্য স্টাম্পে ছিল। আর দ্বিতীয় বলটি স্টাম্প মিস করছিল। মরনে মরকেলও কম যাননি। প্রথম চার ওভার মেডেন নেওয়ার পর পঞ্চম ওভারের পঞ্চম বলে দেন এক রান। সব মিলিয়ে দুই পেসারের দশ ওভারে ২৪ রান পায় বাংলাদেশ। এর মধ্যে রাবাদার করা শেষ ওভারেই আসে ১৭ রান!
চতুর্থ উইকেট জুটিতে ৫৫ রান করে ভালোভাবেই পরিস্থিতি সামলে নিয়েছিলেন তামিম-মুমিনুল। পাশাপাশি দ্বিতীয় দিনের প্রথম আধা ঘন্টায় তাদের প্রতিরোধ ছিল দারুণ। কিন্তু সেই প্রতিরোধ ভাঙে বাজে এক বলে! স্বাগতিকদের সাফল্য এনে দেন অভিষিক্ত পেস অলরাউন্ডার আন্দিলে ফিকোয়াও। তামিমের উইকেট দিয়ে টেস্ট ক্রিকেটে উইকেটের খাতা খোলেন ডানহাতি এই পেসার। লেগ স্টাম্পের বাইরে বেরিয়ে যাওয়া বলে ফ্লিক করতে গিয়ে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দেন তামিম। ডানদিকে ঝাঁপিয়ে বল গ্লাভসবন্দী করেন ডি কক। ৬৭ বলে ৪১ রান করে বিদায় নেন তামিম। তখন বাংলাদেশ পিছিয়ে ৩৩৮ রানে।
তামিম ফিরে যাওয়ার পর ব্যাটিং দ্যুতি ছড়িয়ে মুমিনুল তুলে নেন ক্যারিয়ারের ১২তম ও আফ্রিকার দলটির বিপক্ষে প্রথম হাফ সেঞ্চুরি। মাইলফলকে পৌঁছতে ধৈর্যের পরীক্ষা দেন মুমিনুল। ১৯৭ মিনিট ক্রিজে থেকে ১১২ বলে ৯ বাউন্ডারিতে তুলে নেন হাফ সেঞ্চুরি।
অপরপ্রান্তে থাকা মাহমুদউল্লাহ ঝুঁকি নিয়ে রানের খাতা খোলার পর পেসার ডুয়ান অলিভিয়েরের দুই বল দারুণ ড্রাইভে বাউন্ডারিতে পাঠান। দুটি শটেই ছিল আত্মবিশ্বাস, নিখুঁত টাইমিং ও দারুণ প্লেসমেন্ট। আরেক পেসার ফিকোয়াওয়ের বলে ডাউন দ্য উইকেটে এসে বাউন্ডারি মারতেও ভয় পাননি দলে ফেরা মাহমুদউল্লাহ।
দুজনের ব্যাটে ৬৪ বলেই জুটির পঞ্চাশ রান চলে আসে। ২৭৮ রানে পিছিয়ে প্রথম সেশন শেষ করে বাংলাদেশ। ২৬ ওভারে ৩.৫০ গড়ে ১ উইকেট হারিয়ে সকালের সেশনে ৯১ রান করে বাংলাদেশ। স্বাগতিকদের ছয় সেশনের দাপটের পর এই সেশনেই চোখে চোখ রেখে লড়াই করে বাংলাদেশ।
দ্বিতীয় সেশনেও লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন মুমিনুল-মাহমুদউল্লাহ। সে পথেই হাঁটছিলেন তারা। ৭৭ রান করে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে বাংলাদেশের হয়ে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানের রেকর্ডও গড়েছিলেন মুমিনুল। কিন্তু সেই রানেই শেষ তার দৃঢ়তাপূর্ণ ব্যাটিং। কেশব মহারাজের বল ব্যাকফুটে পাঞ্চ করতে গিয়ে শর্ট লেগে ক্যাচ দেন। মার্করাম খুব সামনে দাঁড়িয়েও দারুণ ক্যাচ ধরেন।
মুমিনুল ফিরে যাওয়ার পর ষষ্ঠ উইকেটে মাহমুদউল্লাহ ও সাব্বির দ্রুত ৬৫ রানের জুটি গড়ে ফেলেন। দ্রুত রান তোলা সাব্বির ভালোই খেলছিলেন। কিন্তু পুরোনো রোগ ‘শর্ট বল’ ঠিকই তাকে সাজঘরের পথ দেখায়। অলিভিয়েরের শর্ট বলে চোখ সরিয়ে নেন সাব্বির। ব্যাটে লেগে বল আঘাত করে স্টাম্পে। এ জুটিতে হাফ-সেঞ্চুরি তুলে নেন মাহমুদউল্লাহ।
১২ রান পর মাহমুদউল্লাহ আউট হলে বাংলাদেশের আশা ভেঙে যায়। চা-বিরতির ১৩ বল আগে ফাফ ডু প্লেসি নতুন বল নেন। নতুন বলে মরনে মরকেলের করা প্রথম বলেই আউট মাহমুদউল্লাহ। মরকেলের অফ স্টাম্পের বাইরের বলে প্লেড অন হন ১২৪ বলে ৬৬ রান করা মাহমুদউল্লাহ। বিরতির আগে তাসিকন রান আউট হন মিরাজের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝিতে। ৮ উইকেটে ৩০৮ রান নিয়ে চা বিরতিতে যায় বাংলাদেশ। বিরতি থেকে ফিরে মুস্তাফিজের ব্যাট থেকে আসে ১০ রান। আর শফিউল করেন ২। ১২ রান যোগ করে প্রোটিয়াদের বিপক্ষে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩২০ রানে শেষ বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস।
একটি জায়গায় বাংলাদেশের উন্নতিতে প্রশংসা করতেই হবে। এর আগে দুই সফরে চার টেস্টে একটিতেও দক্ষিণ আফ্রিকাকে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিংয়ে নামাতে পারেনি বাংলাদেশ। এবার ফলোঅন এড়ানোর মধ্য দিয়ে অতীত কলঙ্ক কিছুটা হলেও মুছেছে সফরকারীরা।
১৭৬ রানে এগিয়ে থেকে ব্যাটিংয়ে নেমে ৩৮ রানে ২ উদ্বোধনী ব্যাটসম্যানকে হারায় দক্ষিণ আফ্রিকা। পেসার শফিউল ইসলাম ডিন এলগারকে (১৮) এলবিডব্লিউ করার পর মুস্তাফিজুর রহমান দুর্বোধ্য কাটারে বধ করেন এইডেন মার্করামকে (১৫)। দ্রুতই দুই ওপেনারকে ফেরানোটা বাংলাদেশের জন্য বড় স্বস্তিই। তৃতীয় উইকেটে জুটি বাঁধেন হাশিম আমলা ও টেম্বা বাভুমা। তবে আলোকসল্পতায় বেশিক্ষণ খেলা হয়নি। দিনের খেলার ১৬.১ ওভার বাকি থাকতেই খেলা শেষ করে দেন আম্পায়াররা।
ম্যাচের লাগাম দক্ষিণ আফ্রিকার হাতে থাকলেও এ ম্যাচ বাঁচানো সম্ভব। দ্বিতীয় ইনিংসে ভালো বোলিংয়ের শুরুটা এখন ধরে রাখতে হবে। এরপর দায়িত্বটা ব্যাটসম্যানদের নিতে হবে। অন্তত পাঁচ সেশন ব্যাটিং করার চ্যালেঞ্জ নিতে হবে তামিম-মুশফিক-মাহমুদউল্লাহদের।