ই-কমার্সের মোড়কে মাল্টিলেভেল মার্কেটিংয়ের প্রতারণা এবং সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে ধারাবাহিক লিখেছেন এম.কে. ত্বহা। আজ থাকছে তিনটি পর্বের প্রথম পর্ব।

এম.কে. ত্বহা, পর্ব- ০১ঃ  ই-কমার্সের মোড়কে মাল্টিলেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) বা বহুমুখী পণ্য বিপণন পদ্ধতির নামে সারা দেশে চলছে লোক ঠকানোর ব্যবসা। অধিক মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে এসব ভুঁইফোঁড় কোম্পানির মালিক পক্ষ। প্রতারণার অভিযোগে সরকার এ পর্যন্ত ৪৫টি কোম্পানির নিবন্ধন বাতিল করেছে। এছাড়াও তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) ছয়টি কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করলেও বাকি প্রতিষ্ঠানগুলো লোক ঠকানোর ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকরা শূন্য হাতে ব্যবসা শুরু করে এবং প্রতারণার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে উধাও হয়। প্রতারকরা অতি অল্প সময়ে দেশ-বিদেশে বাড়ি-গাড়ি কিনে বিত্তবান হলেও প্রতারণার শিকার অসংখ্য মানুষ আজ দিশেহারা, লাঞ্ছিত হচ্ছে পারিবারিক এবং সামাজিক স্তরের প্রতিটি ক্ষেত্রে।
 
দিনের পরে যেমন নতুন দিন আসে, ঠিক তেমনি একটির পর একটি প্রতারনার কোম্পানিও আসে। আসে মানুষকে রাতারাতি স্বপ্নের বাড়ী, ফ্ল্যাট, জমি এবং গাড়ির মালিক বানাতে। কিছুদিন পর এমএলএম নামক হায় হায় কোম্পানিটির যখন যায় যায় অবস্থা , ততোক্ষণে অনেকের পৈত্রিক  বাড়ীটিও উধাও হয়ে মিলিয়ে যায় দূর নীলিমায়। 
ই-কমার্সের খোলসে এমনই এক নতুন এমএলএম কোম্পানি ” প্রিয়জন ই-কমার্স লিমিটেড “। যাদের নেই কোন এমএলএম এর লাইসেন্স। এমনকি লাইসেন্সের জন্য আবেদন পর্যন্ত করেনি কেউ! কী অবাক হচ্ছেন? সামনে আরও কিছু অপেক্ষা করছে… 
 
আইনজীবী, বিতর্কিত ডেসটিনি-২০০০ লি. এর কিছু বিপণন কর্মী, ই-লিঙ্কস নামক গ্যাম্বলিং কোম্পানির জুয়াড়িদের সমন্ব্য়ে গঠিত মালিক পক্ষ এবং এমএলএম লাইসেন্স নবায়ন না পাওয়া ওয়ার্ল্ড মিশন ২১ লি. নামক এমএলএম কোম্পানি থেকে চলে আসা কিছু এমএলএম কর্মীদের নিয়ম বহির্ভূত বিপণন ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে চলছে ” প্রিয়জন ই-কমার্স লিমিটেড ” নামক এই কোম্পানিটির কার্যক্রম।
 
শুধুই কি তাই? ধার করা মানহীন পণ্য, হাইব্রিড পণ্য, বিশেষ রোগের ম্যাজিক সমাধান! শারিরিক শক্তিমত্তা বৃদ্ধির ভয়ংকর সব কেমিক্যালযুক্ত পণ্যের সম্ভার দিয়েই চালিয়ে যাচ্ছে এই ব্যবসা,  রাজধানী  ঢাকাতেই। বিশ্বাস করতে না চাইলেও সত্য যে, “বি সি এস আই আর” থেকেও নেয়া হয়নি পণ্যের শুদ্ধতার কোন একটিরও সার্টিফিকেট। এ ব্যাপারে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শরীফ রায়হানের শরণাপন্ন হলে তিনি জানান; “মানহীন পণ্যের ভয়াবহতার কবলে মৃত্যু ঝুঁকির এক ভয়ংকর তথ্য”।
 .
কথায় বলে; ” চোরেরও ধর্ম আছে “! কিন্তু এই কোম্পানির ব্যবসার কোন একটিও ধর্ম আপনি খুঁজে পাবেন না। একে তো, দুই টাকার পণ্য বিক্রি হচ্ছে হাজার টাকা অনুপাতে, তার উপর মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের বঞ্চিত করা হচ্ছে তাঁদের কমিশন থেকেও! কী বুঝলেন? আরও পরিস্কার করছি-
 .
” প্রিয়জন ই-কমার্স লিমিটেড ” এর একাধিক ডিস্ট্রিবিউটর (নাম না প্রকাশের শর্তানুযায়ী) মালিক পক্ষের লোকদের বিরুদ্ধে প্রকাশ করছেন চরম অসন্তোষ এবং বিক্ষুদ্ধ মনোভাব। তাঁর মাধ্যমেই জানা যায়- ঢাকা, সিলেট, জামালপুর, চাঁদপুর, ময়মনসিং, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন থানা ও জেলা পর্যায় থেকে হাতিয়ে নেয়া হয়েছে বিপুল অংকের নগদ অর্থ। মাঠ পর্যায়ে শেষ সারির ভুক্তভোগীদের ( মন্দের ভালো ) কমিশন নিয়েও চলছে ছলচাতুরী এবং নানা রকম টালবাহানা। পণ্য পাও আর না পাও, টাকা দাও-কমিশন নাও নামক মিথ্যা আশ্বাসকে মগজ ধোলাইয়ের মাধ্যমে বিশ্বাস করিয়ে, প্রয়োজনে কূট-কৌশলে বাধ্য করেও টাকা আত্মসাৎ করারও অভিযোগ পাওয়া গেছে মালিক পক্ষের বিরুদ্ধে।
.
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ আল আমিন এর সাথে এ সংক্রান্ত বিষয়ে কথা বলতে চাইলে তিনি ব্যস্ততার কারন দেখিয়ে এড়িয়ে যান।
 .
প্রশাসন এ বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন এবং যে কোন সময়েই পদক্ষেপ গ্রহন করবেন বলে আশাবাদী প্রতারিত সাধারন ব্যক্তিগণ। এবং কোম্পানির মালিক পক্ষ অর্থ আত্মসাৎ করে কোন ভাবেই যেন বিদেশ পালিয়ে যেতে না পারে, সে ব্যাপারেও সংশ্লিষ্ট মহলকে জানিয়েছেন কোম্পানির প্রতারণার শিকার এমন কয়েকজন।

ছবিঃ প্রিয়জন ই-কমার্স লিমিটেড এর ওয়েবসাইটের স্ক্রীন শটের একাংশ।

” প্রিয়জন ই-কমার্স লিমিটেড ” এর ওয়েবসাইট দেখলে মনে হবে এটি নিছক একটি ই- কমার্স সাইট! আসল ব্যাপারটি হচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতেই এই কৌশল তাঁদের। লগ ইন করলেই বের হয়ে আসে সেই চিরায়িত রুপ- ডান হাত আর বাম হাত!! তাছাড়া কোম্পানির ওয়েব সাইটের স্ক্রীন শটের দিকে খেয়াল করলেই স্পষ্ট হয় যে, ই-কমার্স সাইটের ক্রেতাদের কখনো এমন পদবী হয় না। লাল বৃত্তের দিকে তাকালে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। 
 
উল্লেখ্য,
দেশে এমএলএম (বহুস্তর বিপণন পদ্ধতি) কোম্পানির প্রতারণা বন্ধ হয়নি। এসব প্রতিষ্ঠানের এমএলএম ব্যবসা করার কোনো সনদ না থাকলেও প্রকাশ্যে কার্যক্রম চালাচ্ছে। অধিক লাভের প্রলোভন দেখিয়ে সদস্য বানাচ্ছে সহজ-সরল তরুণ-তরুণীদের। প্রসাধনী ও আয়ুর্বেদিক ওষুধ উচ্চ দামে সদস্যদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন কোম্পানির কর্মকর্তারা। আর ভবিষ্যৎ আয়ের আশায় তাদের সেই পাতা ফাঁদে পা দিচ্ছেন বেকার যুবক-যুবতীরা। আইনে বলা হয়, পিরামিডসদৃশ বিপণন কার্যক্রম চালানো, সুনির্দিষ্ট তথ্যসহ মোড়কজাত না করে পণ্য বিক্রি, প্রতিশ্র“তি অনুযায়ী পণ্য বা সেবা বিক্রি না করা, পণ্য বা সেবার অযৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ, নিন্ম মানের পণ্য বা সেবা বিক্রি করা এবং অসত্য, কাল্পনিক ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে বিজ্ঞাপন প্রচার করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
 
এমতাবস্থায়, সরকারি বিধি-নিষেধ থাকা স্বত্ত্বেও যদি আইনের সুস্পষ্ট লংঘন করে প্রতারণা করা কিছু মানুষের স্বভাব হয়ে যায়, তবে সাধারন মানুষদের পথে বসা ছাড়া কোন উপায় থাকবে না। সুতরাং সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঠিক পদক্ষেপের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে প্রতারিত ব্যক্তিদের।
 
.