নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর : মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামীর সঙ্গে কারাগারে সাক্ষাৎ করেছেন তার স্বজনেরা।
শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে গিয়ে নিজামীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তার স্ত্রী বেগম সামসুন্নাহার নিজামী, ছেলে ব্যারিস্টার নজিব মোমেন ও নাইমুর রহমান, মেয়ে খাদিজা মোহসীনা এবং পুত্রবধু সালেহা ও রাইয়ান।
কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এর জেলার মো. নাশির আহমেদ এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, নিজামী কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার পার্ট-২-এর কনডেম সেলে বন্দী আছেন। আজ সকালে নিজামীর পরিবারের ছয় সদস্য কারাগারে আসেন। তারা নিজামীর সঙ্গে সাক্ষাতের আবেদন করেন। বেলা ১১টার দিকে তারা সাক্ষাতের সুযোগ পান। বেলা ১১টা ২০ মিনিটি থেকে ১২টা ৫ মিনিট পর্যন্ত কথা বলেন।
এর আগে বৃহস্পতিবার একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আলবদর বাহিনীর প্রধান যুদ্ধাপরাধী মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ডাদেশের চূড়ান্ত রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন খারিজ করে দেন আপিল বিভাগ।
প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। এজলাসে গিয়ে প্রধান বিচারপতি শুধু বলেন, ‘ডিসমিসড্’। বেঞ্চের অন্য সদস্যরা হলেন বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।
রিভিউ খারিজের ফলে একাত্তরের হত্যা, ধর্ষণ এবং বুদ্ধিজীবী গণহত্যার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতে ইসলামীর আমিরের মত্যুদণ্ড কার্যকরে আর কোনো আইনি বাধা থাকল না। এখন নিয়ম অনুযায়ী একাত্তরের আলবদরপ্রধান নিজামী নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনার কথা জানিয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইতে পারেন। আর এ বিষয়ের নিষ্পত্তি হলেই সরকার ফাঁসি কার্যকর করবে।
প্রসঙ্গত, ৭২ বছরের নিজামী হলেন বাংলাদেশের মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন করা তৃতীয় ব্যক্তি এবং পঞ্চম যুদ্ধাপরাধী, যার সর্বোচ্চ সাজার রায় কার্যকরের পর্যায়ে এসেছে। পাবনা-১ আসন থেকে তিনবার সাংসদ নির্বাচিত হওয়া নিজামীকে ২০০১ সালে মন্ত্রিত্ব দেন খালেদা জিয়া।
প্রথমে দুই বছর তিনি কৃষিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। বিএনপির সরকারের পরের তিন বছর শিল্পমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। আর সে সময়েই ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফার জন্য পাচারের পথে চট্টগ্রামে ১০ ট্রাক অস্ত্র ধরা পড়ে, যে মামলার রায়ে গতবছর নিজামীর ফাঁসির আদেশ হয়।
এর আগে মঙ্গলবার রিভিউ আবেদনের শুনানি শেষে রায় ঘোষণার জন্য বৃহস্পতিবার দিন ধার্য করেন আপিল বিভাগ। গত ৩ এপ্রিল নিজামীর রিভিউ আবেদন শুনানির জন্য এক সপ্তাহের সময় দেন আপিল বিভাগ।
গত ২৯ মার্চ ফাঁসির দণ্ড থেকে খালাস চেয়ে রিভিউ আবেদন দাখিল করেন নিজামী। ৭০ পৃষ্ঠার রিভিউ আবেদনে ফাঁসির দণ্ড থেকে খালাস চেয়ে ৪৬টি যুক্তি দেখানো হয়।
এর আগে গত ১৫ মার্চ নিজামীর আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাসহ আপিল বিভাগের চার বিচারপতির স্বাক্ষরের পর এ রায় প্রকাশ করা হয়।
গত ৬ জানুয়ারি বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনাকারী ও উসকানিদাতাসহ মানবতাবিরোধী তিনটি অপরাধের দায়ে দোষী জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসির রায় বহাল রাখেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ফাঁসির রায়ের বিরুদ্ধে নিজামীর করা আপিল আংশিক মঞ্জুর করে রায় ঘোষণা করা হয়।
বুদ্ধিজীবী নিধনসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে ২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর নিজামীকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় নিজামীর বিরুদ্ধে আনা ১৬টি অভিযোগের মধ্যে আটটি ট্রাইব্যুনালে প্রমাণিত হয়। এর মধ্যে পাবনার বাউসগাড়ি ও ডেমরা গ্রামে ৪৫০ জনকে নির্বিচারে হত্যা ও ধর্ষণ, করমজা গ্রামে ১০ জনকে হত্যা ও তিনজনকে ধর্ষণ, ধুলাউড়ি গ্রামে ৫২ জনকে হত্যা এবং বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনার দায়ে (২, ৪, ৬ ও ১৬ নম্বর অভিযোগ) ট্রাইব্যুনাল নিজামীকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন।
আপিল বিভাগের রায়ে করমজা গ্রামে ১০ জনকে হত্যা ও তিনজনকে ধর্ষণের দায় (৪ নম্বর অভিযোগ) থেকে নিজামীকে খালাস দেওয়া হয়। বাকি তিন অভিযোগে তার মৃত্যুদণ্ডাদেশ আদেশ বহাল রাখা হয়।