নীলয় Bnp_logo1461774293কান্ত দাস: দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ রাজনৈতিক ইস্যুতে মাঠে থেকে সরকারকে চাপে রাখার পরিবর্তে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে উল্টো চাপে পড়েছে বিএনপি। দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে প্রতিটি পর্যায়ে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন প্রকট।

 

বিশেষ করে বিএনপির নতুন কমিটি বেশ কিছু পদ ঘোষণার পর এই পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। নেতাদের এই দ্বন্দ্বে বেরিয়ে আসছে মনোনয়ন বাণিজ্যসহ দলের অভ্যন্তরীণ নানা দুর্নীতির খবর।

 

নেতাদের মধ্যে পারস্পরিক এই অবিশ্বাস-শত্রুতায় বিব্রত দলটির হাইকমান্ডও। দলীয় সূত্রে জানা গেছে এ সব তথ্য।

 

দলীয় সূত্র বলছে, নতুন কমিটির বেশ কয়েকটি পদ ঘোষণার পর ‘যোগ্য অথচ বঞ্চিত’ অনেক নেতা ক্ষুদ্ধ হন। কমিটি ঘোষণার পরপরই আড়ালে থেকে নেতাদের ‘মুখোশ উন্মোচনের’ রাজনীতিতে নামেন তারা। এতে সফলও হন। এরই ধারাবাহিকতায় দলের সহ-দপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপুর একটি ব্যাংক স্টেটমেন্টকে কেন্দ্র করে বিএনপিতে এখন আতঙ্ক চলছে।

 

অভিযোগ উঠেছে, ২০১৫ সালের ৫ এপ্রিল থেকে চলতি বছরের ৫ এপ্রিল পর্যন্ত  তাইফুলের মালিকানাধীন কোম্পানি ‘মেসার্স টি এন্টারপ্রাইজ’- এর নামে মোট ৪ কোটি ৩৮ লাখ ৫২ হাজার ৩৭৩ টাকা জমা হয়েছে। এই সময়ে ব্যাংক থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে ৪ কোটি ৩৭ লাখ ৫২ হাজার ৩৭২ টাকা। এতে দেখা যায়, পাবনা, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অনলাইনে ওই হিসাব নম্বরে টাকা জমা হয়েছে। লেনদেনের হিসাবে দেখা যায়, বেশির ভাগ টাকাই নগদ জমা ও তোলা হয়েছে।

 

এই লেনদেনে পৌরসভা নির্বাচন ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনগুলোর মনোনয়ন বাণিজ্যের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। বলা হচ্ছে, মনোনয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাইফুলকে ‘কোষাধ্যক্ষ’ হিসেবে ব্যবহার করে থাকতে পারেন। অর্থাৎ তার হিসাবে টাকা জমা হয়েছে, যা পরে মনোনয়ন নিশ্চিত করেছেন এমন নেতা বা ব্যক্তিদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হয়েছে।

 

সূত্র বলছে, গণমাধ্যমে এই ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশের পর দলের অনেক শীর্ষ নেতাও সন্দেহের তালিকায় এসে পড়ছেন। এ নিয়ে বিএনপির হাইকমান্ড যেমন বিব্রত, তেমনি বিশ্বস্ত অনেক নেতার নাম চলে আসায় তারাও রয়েছে আতঙ্কে। দলের মধ্যম সারির একজন নেতা জানান, যেভাবে নেতারা নিজেদের আড়ালে রেখে একে অপরের মুখোশ উন্মোচনের প্রতিযোগিতায় নেমেছেন, তাতে আরো নতুন নতুন তথ্য প্রকাশ্যে চলে আসতে পারে।

 

সরকার বিরোধী আন্দোলনের আগে দলকে সুসংগঠিত করতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দলের ষষ্ঠ কাউন্সিলের পর ধাপে ধাপে বিভিন্ন পদে পরিবর্তন আনছেন। এর অংশ হিসেবে এখন পর্যন্ত ৪০টি পদে নাম ঘোষণা করা হয়েছে। বিএনপি মহাসচিব হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, কোষাধ্যক্ষ মিজানুর রহমান সিনহা, যুগ্ম মহাসচিব পদে ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, মজিবুর রহমান সরোয়ার, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, খায়রুল কবীর খোকন, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, হারুন অর রশীদ ও আসলাম চৌধুরী।

 

নতুন কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদকরা হচ্ছেন ফজলুল হক মিলন (ঢাকা), নজরুল ইসলাম মঞ্জু (খুলনা), রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু (রাজশাহী), আসাদুল হাবিব দুলু (রংপুর), শাহাদাত হোসেন (চট্টগ্রাম), সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স (ময়মনসিংহ), সাখাওয়াত হাসান জীবন (সিলেট), বিলকিস শিরীন (বরিশাল) ও শামা ওবায়েদ (ঢাকা/ফরিদপুর), সাখাওয়াত হাসান জীবন (সিলেট)।

 

এছাড়া ঢাকা বিভাগের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক হলেন- অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম আজাদ, চট্টগ্রাম বিভাগে মাহবুবুর রহমান শামীম ও আবুল হাশেম বকর, রাজশাহীতে আবদুল মোমিন তালকুদার খোকা ও শাহীন শওকত, খুলনায় অনিন্দ্য ইসলাম অমিত ও জয়ন্ত কুমার কুন্ডু, বরিশালে আকন্দ কুদ্দুস ও মাহবুবুল হক নান্নু, সিলেটে দিলদার হোসেন সেলিম ও কলিম উদ্দিন মিলন, রংপুরে শামসুজ্জামান ও জাহাঙ্গীর হোসেন, কুমিল্লায় মুস্তাক হোসেন, ময়মনসিংহে শরিফুল আলম ও ওয়ারেস আলী মামুন এবং ফরিদপুর বিভাগে আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম ও সেলিমুজ্জামান সেলিম।

 

এ ছাড়া কুমিল্লা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে কর্নেল (অব.) আনোয়ারুল আজিম, সহ-সাংগঠনিক শহীদুল ইসলাম বাবুল, মোস্তাক মিয়া, আব্দুল আওয়াল খানের নাম ঘোষণা করা হয়েছে।

 

কমিটি ঘোষণার পর থেকেই দলের মধ্যে অভিযোগ ওঠে, নতুন এসব পদে অনেককে আনা হয়েছে, যারা শুধু অপরিচিত মুখই নন, বিগত আন্দোলন সংগ্রামে যাদের ছায়াও কেউ দেখেননি। অথচ হামলা মামলায় বিপর্যস্ত অনেক নেতাই ছিলেন এসব অনেক পদের যোগ্য। এ জন্য তারা গুলশান কার্যালয়ের একটি সিন্ডিকেট এবং পল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের একটি সিন্ডিকেটকে দায়ী করেন। তারা মনে করেন, বিএনপি নেত্রী ‘প্রভাবিত করে’ ওই সিন্ডিকেট তাদের অনুসারীদের পদে এনেছে। এজন্য ওই সিন্ডিকেটের আসল রূপ বিএনপি চেয়ারপারসনের কাছে প্রকাশ করতে মরিয়া হয়ে উঠছেন তারা।

 

সূত্র জানান, কমিটি ঘোষণা পরই ক্ষুব্ধ নেতারা দায়িত্বশীলদের ‘মুখোশ উন্মোচনে’ নামে। এর অংশ হিসেবে একাউন্টে কোটি টাকার লেনদেনের বিষয়টিও গণমাধ্যমের সামনে নিয়ে আসেন তারা। পর্দার আড়ালে থেকে বিএনপির নেতাদের মধ্যে পারস্পরিক এই কাঁদা ছোড়াছুড়িতে দলের পরিস্থিতি এখন সন্দেহে রূপ নিয়েছে। কার বিরুদ্ধে কখন আরো বড় অভিযোগ উঠে আসে, সেই আতঙ্কে রয়েছেন তারা। এই অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিসিহ রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে কর্মসূচি করার কথা বলার পরিবর্তে এখন ঘর সামলাতেই ব্যস্ত সময় পার করছে দলটি।

 

বিএনপির মধ্যম সারির একজন নেতা বলেন, মনোনয়ন বাণিজ্য এবং লেনদেনের বিষয়ে যে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাতে দলের অনেক নেতাই খুশি হয়েছেন। কারণ এই সিন্ডিকেটটিই বিএনপিতে দাঁপিয়ে বেড়ায়। তাদের প্রভাবে ভীত থাকে অনেক নীতিনির্ধারকও। বিশেষ করে গুলশান কার্যালয়ের ওই নেতার বিরুদ্ধে রয়েছে হাজারো অভিযোগ। এখন আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি উঠে আসায় তাদের মুখোশ আরেক দফা উন্মোচন হলো।