রাজধানীর উত্তরখানে তুরাগ নদ থেকে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক সামরিক পাইলট ও কর্মকর্তা তাহসিফ সাউরির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় রহস্যের জট খুলতে শুরু করেছে। এবার তার মোটরসাইকেলের খোঁজ মিলেছে।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) জানিয়েছে, টঙ্গীর তুরাগ নদীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়েছে। শুক্রবার পিবিআই প্রধান মোস্তফা কামাল জানান, তুরাগ নদে যেখান থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল, তার কাছাকাছি থেকেই মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়।
গত মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রাতে শাহরিয়ার দীপ নামে স্থানীয় এক তরুণকে সঙ্গে নিয়ে উত্তরার বাসা থেকে বের হন তাহসিফ। এরপর আর বাড়ি ফেরেননি তিনি। বুধবার বিকেলে তুরাগ নদী থেকে তাহসিফের লাশ উদ্ধার করে নৌ-পুলিশ। হাতঘড়ি ও পকেটে থাকা আইফোনের সূত্র ধরে মরদেহটি তাহসিফ সাউরির বলে শনাক্ত করা হয়।
দীপ জানিয়েছিলেন, তাহসিফের মোটরসাইকেলে সমস্যা থাকায় তারা ওয়ার্কশপে যান। মোটরসাইকেল ঠিক করার পর সেখান থেকে রুয়াপ কমপ্লেক্সে গিয়ে একটি রেস্টুরেন্টে একসঙ্গে রাতের খাবার খান। এরপর দীপ নিজের একটি কাজে চলে যান এবং পরে নিজের বাসায় ফিরে আসেন। তারপর থেকে মোটরসাইকেলটির খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না।
এদিকে মৃত্যুর রহস্য উদঘাটনে তাহসিফের ‘জুনিয়র বন্ধু’ শাহরিয়ার দীপকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পিবিআই। নিখোঁজ হওয়ার আগে তাহসিফের সঙ্গে প্রায় ছয় ঘণ্টা সময় কাটিয়েছিলেন দীপ।
পিবিআই বলছে, বৃহস্পতিবার রাতে দীপকে পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তর কার্যালয়ে নেওয়া হয়। নিখোঁজের আগে তাহসিফ ও দীপ একসঙ্গে থাকায় দীপের দেওয়া বক্তব্য ও বিভিন্ন তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদে দীপ যেসব তথ্য দিয়েছেন, তদন্ত কর্মকর্তারা সেগুলো সরেজমিনে যাচাই-বাছাই ও বিশ্লেষণ করছেন। বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানার বাবর রোডের বি ব্লকের একটি বাসার তৃতীয় তলা থেকে দীপকে নিয়ে যায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। দীপ ওই এলাকার বাসিন্দা সেলিম রেজার ছেলে।
তাহসিফের মৃত্যুর আগে তার বাসার নিচে এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলা ও হাত মেলানোর একটি সিসিটিভি ফুটেজ সামনে এসেছে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে রাজধানীর উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের একটি গ্যারেজের সামনে সবুজ পাঞ্জাবি পরা তাহসিফকে ওই ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলতে ও হাত মেলাতে দেখা যায়। পরিবারের সদস্যরা ওই ব্যক্তিকে তার ‘জুনিয়র বন্ধু’ দীপ হিসেবে শনাক্ত করেন। ফুটেজে দেখা যায়, হাত মেলানোর পর তারা আলাদা দুটি মোটরসাইকেলে সেখান থেকে চলে যান।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, দীপের ডাকে সাড়া দিয়ে তাহসিফ বাসা থেকে বের হয়েছিলেন। তবে তাহসিফের নিখোঁজ হওয়া এবং পরবর্তীতে তার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় দীপের ভূমিকা কী, তা তদন্তসাপেক্ষ।
এর আগে, ২৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তুরাগ নদে একটি মরদেহ ভাসতে থাকার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ। পরে টঙ্গী নদী পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে মরদেহটি উদ্ধার করেন।
পরদিন বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। বিকেল সাড়ে ৪টা ৩৫ মিনিটে উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
তাহসিফের মৃত্যুর কারণ নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি পুলিশ। তার বাবা কে এম এনায়েতুল করিমের আশঙ্কা, তার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) গণমাধ্যমকে তিনি জানান, ২৭ অক্টোবর সারাদিন পরিবারের সদস্যদের জন্য কেনাকাটা করেছিলেন তাহসিফ। মাকে সঙ্গে নিয়ে বাবাসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্যও কেনাকাটা করেন তিনি। সন্ধ্যার পর দীপ নামের এক জুনিয়রের ডাকে বাসা থেকে বের হওয়ার পর আর ফেরেননি।
তাহসিফের বাবা বলেন, রাত ১টা ৩৫ মিনিটে ছেলের কাছ থেকে ‘আম্মু আমি আসছি’ লেখা একটি মেসেজ পেয়েছিলেন তারা। এরপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে ভোর সোয়া ৫টার দিকে পুলিশের কাছ থেকে ছেলের মরদেহ উদ্ধারের খবর পান তারা। তার ভাষ্য, রাজাবাড়ী ঘাট এলাকায় এর আগে কখনো যাননি তাহসিফ।
তাহসিফের চাকরিচ্যুতির বিষয়ে তার বাবা জানান, শৃঙ্খলাজনিত কারণে তাকে বরখাস্ত করা হয়েছিল বলে বিমানবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়। ওই সময় আরও কয়েকজনকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। পরে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডসহ বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন তাহসিফ।