জুলাই অভ্যুত্থানের পর সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) ও তার ওপরের পদমর্যাদার ১৪৭ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া অভ্যুত্থানের পর কর্মস্থল থেকে পলায়নের অভিযোগে বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের ৬২ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৩১ জনকে ইতোমধ্যে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। বাকিদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা এখনও চলছে।
বৃহস্পতিবার (১৫ আগস্ট) জাতীয় সংসদ ভবনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির পঞ্চম বৈঠকে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীনের সভাপতিত্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দীন আহমেদ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, সংসদের হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, মনোয়ার হোসেন, শিরীন সুলতানা, নূরুল ইসলাম ও আব্দুল বাতেন এই বৈঠকে অংশ নেন।
গত ১৩ আগস্ট কমিটির প্রথম বৈঠকে গণঅভ্যুত্থানে বিতর্কিত বা নেতিবাচক ভূমিকা পালনকারী এবং শাস্তি পাওয়া পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল। বৃহস্পতিবারের বৈঠকে ওই সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রতিবেদনে পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া বিভিন্ন ব্যবস্থার বিস্তারিত হিসাব দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টকে কেন্দ্র করে সংঘটিত ঘটনায় কর্মস্থলে অনুপস্থিত বা পলাতক থাকার কারণে এএসপি ও তার ওপরের পদমর্যাদার ৫৭ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাও করা হয়েছে। এই ৫৭ কর্মকর্তার মধ্যে বিভাগীয় মামলায় ২৮ জনকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। একজনকে জনস্বার্থে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে।
এছাড়া, গণঅভ্যুত্থানকেন্দ্রিক বিভিন্ন ফৌজদারি মামলা, আদালতে দায়ের করা অভিযোগ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলায় গ্রেপ্তার ২৯ পুলিশ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে উপমহাপুলিশ পরিদর্শক (ডিআইজি) পদমর্যাদার দুজনকে জনস্বার্থে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ও ২-এর ২০২৫ সালের চারটি মামলার রায়ের ভিত্তিতে এএসপি ও তার ওপরের পদমর্যাদার ১৩ কর্মকর্তার বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে দণ্ডিত পাঁচ কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। বাকি আট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলছে।
গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনার কারণে পুলিশ পরিদর্শক পদমর্যাদার পাঁচ কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত বা অপসারণ করা হয়েছে। একই ঘটনায় আরও ৩০ পুলিশ পরিদর্শকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যক্রম চলছে। এছাড়া, অভ্যুত্থানের পর পুলিশ পরিদর্শক পদমর্যাদার ৭৩ কর্মকর্তাকে জনস্বার্থে অবসরে পাঠিয়েছে সরকার। গণঅভ্যুত্থানকেন্দ্রিক ঘটনায় সংশ্লিষ্ট অন্য পুলিশ পরিদর্শকদের বিরুদ্ধেও চাকরিবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যক্রম চলছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
কমিটির সদস্য শিরীন সুলতানা প্রশ্ন তোলেন, গণঅভ্যুত্থানে যেসব পুলিশ কর্মকর্তা বিতর্কিত বা নেতিবাচক ভূমিকায় ছিলেন কিংবা শাস্তি পেয়েছিলেন, তারা কীভাবে নরসিংদী ও ঢাকার আশপাশের থানায় আবার পদায়ন পাচ্ছেন। এ বিষয়ে তদন্ত করে অভিযুক্ত ও বিতর্কিত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
আরেক সদস্য মনোয়ার হোসেন বলেন, গুম কমিশনের প্রতিবেদনে যাঁদের নাম এসেছে এবং যারা বিভাগীয় শাস্তি পেয়েছেন, তাদের অনেকে এখনো বিভিন্ন পদে বহাল রয়েছেন। এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্রসচিব ও পুলিশ মহাপরিদর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।
বৈঠকে পুলিশের মনোবল ফেরানোর বিষয়টিও আলোচনায় আসে। সংসদ সদস্য আব্দুল বাতেন বলেন, গণঅভ্যুত্থানের সময় পুলিশের অবকাঠামো ও যানবাহনের ক্ষতির পাশাপাশি সদস্যদের মনোবল ও মানসিক অবস্থার ওপরও বড় প্রভাব পড়েছে। পুলিশ সদস্যদের মনোবল ফেরাতে বিশেষ প্রশিক্ষণ এবং বাজেটে আলাদা বরাদ্দ রয়েছে কি না, তা জানতে চান তিনি।
জবাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী জানান, পুলিশের মনোবল বাড়াতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ চলছে। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে মবের কারণে পুলিশকে দায়িত্ব পালনে বিভিন্ন বাধা ও বিড়ম্বনার মুখে পড়তে হয়েছে। থানায় পুলিশ কর্মকর্তা লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান স্বরাষ্ট্রসচিব।
এদিন সংসদ সচিবালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পঞ্চম বৈঠকে ২০২৫ ও ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অপরাধের তুলনামূলক পরিসংখ্যান উপস্থাপন করা হয়। এসব পরিসংখ্যানে ডাকাতি, দস্যুতা, খুন, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, অপহরণ, চুরি, মাদকদ্রব্য, অস্ত্র আইন এবং বিস্ফোরক দ্রব্য-সংক্রান্ত মামলার তথ্য ছিল।
বৈঠকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য উন্নতির চিত্রও উঠে এসেছে। এতে কমিটির সদস্যরা সন্তোষ প্রকাশ করেন। এসময় সারা দেশে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে নেওয়া পদক্ষেপের অগ্রগতি নিয়েও আলোচনা হয়। অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সুপারিশ করে কমিটি। এ ছাড়া পৃথক সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠনের উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা হয়।
বৈঠকে কমিটির সদস্য নূরুল ইসলাম রাজধানীর সাম্প্রতিক অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চান। জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দীন আহমেদ অপরাধ প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রম ও অগ্রগতি তুলে ধরেন।