মোস্তফা কামাল তোহা: মধ্যপ্রাচ্যে একের পর এক সংঘাতের বিস্তার শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতিকেই চাপে ফেলছে না, এর প্রভাব পড়ছে সৌদি আরবের কৌশলগত সিদ্ধান্তের ওপরও। ইরান-সংঘাত, ইয়েমেনে হুথিদের তৎপরতা, উপসাগরীয় নিরাপত্তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক সমন্বয়। সব মিলিয়ে কঠিন এক সময় পার করছে রিয়াদ। এর মধ্যেই সৌদি রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও ভবিষ্যৎ ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

সৌদি আরবে বর্তমানে ক্ষমতার কেন্দ্র ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের হাতে। ২০১৭ সালে তিনি ক্রাউন প্রিন্স হওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করেছেন। ২০২২ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রীও হন। চলতি বছরের আগস্টে বাদশাহ সালমানের ডিক্রিতে তাঁর সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন করা হয়।

কিন্তু বর্তমান আঞ্চলিক সংঘাত সেই ক্ষমতার কাঠামোর সামনে নতুন কিছু প্রশ্ন তৈরি করেছে।

ইরান-সংঘাতের প্রভাবে উপসাগরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা বড় ধরনের চাপে পড়েছে। সৌদি ক্রাউন প্রিন্স সম্প্রতি শুরা কাউন্সিলে দেওয়া বক্তব্যে বলেছেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা পরস্পর অবিচ্ছেদ্য এবং যেকোনো হুমকির বিরুদ্ধে সৌদি আরব দৃঢ়ভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে। একই সঙ্গে তিনি উত্তেজনা কমানো এবং কূটনৈতিক সমাধানের কথাও বলেছেন।

আরেকটি বড় চাপ তৈরি হয়েছে ইয়েমেনকে ঘিরে। ইরান-সমর্থিত হুথিদের বিরুদ্ধে ইয়েমেনে বড় ধরনের সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরব। বাব আল-মান্দাব নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি এখন রিয়াদের জন্য শুধু ইয়েমেনের সমস্যা নয়; এটি লোহিত সাগরের বাণিজ্যপথ ও সৌদি নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।

এই পরিস্থিতিতে সৌদি নেতৃত্বের সামনে বড় প্রশ্ন, দেশটি কি আবার সরাসরি দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক সংঘাতে জড়াবে, নাকি কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তিকে অগ্রাধিকার দেবে?

কারণ মোহাম্মদ বিন সালমানের ভিশন ২০৩০-এর অন্যতম লক্ষ্য ছিল তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পর্যটন, বিনোদন, প্রযুক্তি ও অন্যান্য খাতের মাধ্যমে অর্থনীতি বৈচিত্র্যপূর্ণ করা। কিন্তু সাম্প্রতিক যুদ্ধের কারণে সৌদি আরবকে অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারও নতুন করে পর্যালোচনা করতে হচ্ছে। চলতি বছর যুদ্ধের আর্থিক চাপের মধ্যে সৌদি আরব ২০২৭ সালের জয় অ্যাওয়ার্ড বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, একই সঙ্গে ভিশন ২০৩০-এর কয়েকটি বড় প্রকল্পেও কাটছাঁট বা বিলম্বের খবর এসেছে।

সৌদি রাজপরিবারে ক্ষমতার দ্বন্দ্বের ইতিহাস একেবারে নতুন নয়। ২০১৭ সালে মোহাম্মদ বিন সালমান ক্রাউন প্রিন্স হওয়ার আগে মোহাম্মদ বিন নায়েফ ছিলেন উত্তরাধিকারী। পরবর্তী সময়ে ক্ষমতার কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসে। ২০২০ সালে সাবেক ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন নায়েফ এবং বাদশাহ সালমানের ভাই প্রিন্স আহমেদ বিন আবদুল আজিজকে আটক করা হয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধে ক্রাউন প্রিন্সের উত্তরাধিকার ঠেকানোর চেষ্টার অভিযোগের কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে। সৌদি সরকার এসব বিষয়ে বিস্তারিত প্রকাশ করেনি।

তবে অতীতের এসব ঘটনা বর্তমানেও রাজপরিবারে বিভাজন রয়েছে, এমন ঘটনা সরাসরি সামনে না এলেও সৌদি সিংহাসনের উত্তরাধিকার ও ক্ষমতার প্রশ্ন অতীতেও স্পর্শকাতর ছিল।

২০২২ সালেও উত্তরাধিকার প্রশ্ন সামনে রেখে রাজপরিবারের ঐক্য প্রদর্শনের চেষ্টা দেখা গিয়েছিল। রয়টার্স-এর প্রতিবেদনে সে সময় প্রিন্স আহমেদের ছেলে আবদুল আজিজ বিন আহমেদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সৌদি প্রতিনিধিদলে উপস্থিতিকে রাজপরিবারের ঐক্যের বার্তা হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়েছিল।

তবে বর্তমান পরিস্থিতির বিশেষত্ব হলো, সৌদি আরবকে একই সময়ে একাধিক ফ্রন্ট সামলাতে হচ্ছে। ইরান-সম্পর্কিত আঞ্চলিক সংঘাত, হুথিদের তৎপরতা, লোহিত সাগরের নিরাপত্তা, তেলের বাজার এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক, সবকিছুর ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে রিয়াদকে।

এমনকি সেপ্টেম্বরেও রয়টার্স জানায়, হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক সহায়তার জন্য মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। ওয়াশিংটন সরাসরি হামলায় অংশ নিতে রাজি না হলেও গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তার কথা জানিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।

এর পাশাপাশি সৌদি-সংযুক্ত আরব আমিরাত সম্পর্কেও গত এক বছরে বড় ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। ইয়েমেন, তেলনীতি ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই দেশের অবস্থানের পার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে। মে মাসে যুক্তরাজ্যের হাউস অব কমন্স লাইব্রেরির বিশ্লেষণেও দুই দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান নীতিগত ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার কথা উল্লেখ করা হয়।

তবে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে আবুধাবির প্রভাবশালী নেতা শেখ মনসুর বিন জায়েদের সৌদি সফর দুই দেশের মধ্যে নতুন করে সহযোগিতার সম্ভাবনার ইঙ্গিতও দিয়েছে। অর্থাৎ আঞ্চলিক বিভাজন যেমন আছে, তেমনি সংকট মোকাবিলায় সমঝোতার চেষ্টাও চলছে।

বিশ্লেষকদের সামনে এখন মূল প্রশ্নটি হলো- দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ, অর্থনৈতিক চাপ এবং আঞ্চলিক নীতির প্রশ্নে সৌদি রাজপরিবারের বিভিন্ন অংশের মধ্যে মতপার্থক্য কতটা গভীর হতে পারে।

মোহাম্মদ বিন সালমান গত প্রায় এক দশকে সৌদি ক্ষমতার কাঠামোকে এমনভাবে পুনর্গঠন করেছেন যে তাঁর নেতৃত্বের বিকল্প কোনো শক্তিশালী রাজকীয় কেন্দ্র প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে না। ফলে বর্তমান সংঘাতকে কেন্দ্র করে রাজপরিবারে বিভাজন আসন্ন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো এখনই কঠিন। তবে, সৌদি  রাজ পরিবারের সব কিছু প্রকাশ্যে না আসায় বিভাজনের মতো ঘটনা ঘটলেও আগে জানাশোনার সুযোগ নেই।

বরং বাস্তব চিত্র হলো, আঞ্চলিক যুদ্ধ সৌদি নেতৃত্বের ওপর অভূতপূর্ব কৌশলগত ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করছে। সেই চাপ দীর্ঘায়িত হলে রাজপরিবারের ভেতরে নীতিগত মতপার্থক্য প্রকাশ্যে আসবে কি না, সেটিই এখন পর্যবেক্ষণের বিষয়।

আর সেই কারণেই মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের পরবর্তী অধ্যায় শুধু ইরান, ইসরায়েল বা ইয়েমেনের জন্য নয়। সৌদি আরবের ক্ষমতার ভবিষ্যৎ কাঠামোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

লেখকঃ মোস্তফা কামাল তোহা, জ্যেষ্ঠ বার্তা সম্পাদক, আনন্দ টিভি