জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে (ইউএনজিএ) ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে জোরালো সমর্থন জানিয়েছে ফ্রান্স, কানাডা ও যুক্তরাজ্য। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ গাজায় ত্রাণের ওপর ইসরায়েলি নিষেধাজ্ঞাকে পুরো বিশ্বের জন্য একটি ‘লজ্জার’ বিষয় বলে সমালোচনা করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গত অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়া সত্ত্বেও গাজায় প্রাণঘাতি হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে গাজায় এখন পর্যন্ত ৭৩ হাজার ৯০০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পর থেকে নিহত হয়েছেন ১ গাজার ৩৯৯ জন।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁ বলেন, এক বছর আগে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া এক ডজন দেশের মধ্যে ফ্রান্সও ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি প্রশ্ন রাখেন, “গাজার সামনে যদি আমরা নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকি, তাহলে আমাদের আর কী বা বিশ্বাসযোগ্যতা থাকে?”
তিনি বলেন, “কেউ কেউ কথিত শান্তির বড়াই করে, কিন্তু এই শান্তি এক মুহূর্তের জন্যও মানবিক পথগুলো খুলে দিতে পারেনি।”
“আমরা কি এই দৃশ্য দেখে হাত গুটিয়ে বসে থাকব, যা আমাদের সবার জন্য লজ্জাজনক? কখনোই না!”
ম্যাখোঁ অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের প্রতিদিনের ‘লঙ্ঘনমূলক কর্মকাণ্ডেরও’ সমালোচনা করেন।
তিনি সতর্ক করে বলেন, “যারা দাবি করেন যে ইসরায়েলের নিরাপত্তা তার সব প্রতিবেশীর সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের ওপর নির্ভর করে, তারা একটি মারাত্মক ভুল করছেন; এটি আজকের ও আগামীকালের জন্য ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে দুর্বল করছে এবং তা হুমকির মুখে ফেলছে।”
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন সংক্রান্ত একটি বিশেষ বৈঠকে যৌথভাবে সভাপতিত্ব করেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম, কানাডার প্রধানমন্ত্রী মাইক কার্নি এবং সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ।
বৈঠকে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের উদ্দেশ্যে বলেন, দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান বাস্তবায়নে ব্যর্থতা রাজনীতিবিদদের প্রতি মানুষের বিশ্বাসকে ‘ক্ষুণ্ন করবে’, যারা কেবল এই ইস্যুটি নিয়ে কথা বলেই যাচ্ছেন কিন্তু কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছেন না।
তিনি জানান, যুক্তরাজ্য ইতিমধ্যে অধিকৃত পশ্চিম তীরে অবৈধ ইসরায়েলি বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য নিষিদ্ধ করেছে। বিশেষ করে ইসরায়েলের ‘ই১’ বসতি প্রকল্পের তীব্র সমালোচনা করে তিনি একে দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান নস্যাৎ করার একটি ‘উদ্দেশ্যপ্রণোলিত চেষ্টা’ বলে অভিহিত করেন। এই প্রকল্পের মধ্যেমে পশ্চিম তীর দ্বিখণ্ডিত হয়ে পূর্ব জেরুজালেমের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বার্নহাম আরো বলেন, “আমরা সবাই রাজনীতিতে আস্থার সংকটের এক যুগে বাস করছি। এই কক্ষের অনেকেই, বিশ্বের অনেক রাজনীতিবিদ দশকের পর দশক ধরে দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের কথা বলে আসছেন। কিন্তু আমরা যদি কথার সঙ্গে কাজের মিল না রাখি, তাহলে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের আস্থা আরো নষ্ট হবে।”
এদিকে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মাইক কার্নি ঘোষণা করেছেন “দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনা বাঁচিয়ে রাখতে’ কানাডা ফিলিস্তিনিদের জন্য ১০০ মিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার (৭১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) সহায়তা প্রদান করবে। তিনি জানান, এই তহবিলের ৮০ শতাংশ সরাসরি মানবিক সহায়তায় ব্যয় করা হবে ও বাকি ২০ শতাংশ অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি পুলিশকে প্রশিক্ষণসহ শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় ব্যয় করা হবে।
কার্নি বলেন, গাজায় ফিলিস্তিনিরা চরম মানবিক দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন, অন্যদিকে ইসরায়েলিরা হামাস এবং ইরান ও তার মিত্রদের পক্ষ থেকে ‘অস্তিত্বগত হুমকির’ মুখে রয়েছে। তিনি ইসরায়েলের ‘ই১’ বসতি প্রকল্পেরও সমালোচনা করে জানান, কানাডা অধিকৃত অঞ্চলে উৎপাদিত পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিকল্পনা করছে।
গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে অটোয়া ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের জন্য ৬০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের (৪২৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) বেশি সহায়তা দিয়েছে।
তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা