আন্তর্জাতিক 10ডেস্ক : বিমান আবিষ্কারের পর দূরত্বকে জয় করে মানুষ। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বহির্বিশ্বে যোগাযোগের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে বিমান।

 

আকাশ পথে সহজ যোগাযোগের এই বাহন শুরু থেকেই কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। দুর্ঘটনা ও ছিনতাই বিমানের ইতিহাসে অনেক ভয়ংকর ও বিয়োগাত্মক ঘটনার জন্ম দিয়েছে।

মঙ্গলবার মিশরের একটি বিমান ছিনতাইয়ের শিকার হয়। ঘটনার নাটকীয়তা বিশ্ববাসীর দৃষ্টি কেড়েছে। বিমান ছিনতাইয়ের এরকম ঘটনা বহু আগে থেকে ঘটে আসছে। এখানে ভয়ংকর কিছু বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনা প্রিয়আলোর পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

এল আল এয়ারলাইন্স ৪২৬ (১৯৬৮)
ইসরায়েল ভিত্তিক এল আল এয়ারলাইন্সের ৪২৬ নম্বর ফ্লাইটটি ১৯৬৮ সালে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামীরা ছিনতাই করে। তৎকালীন ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্যা লিবারেশন অব প্যালেস্টাইন (পিএফএলপি)-এর তিন সদস্য ৪২৬ নম্বর ফ্লাইটটি ছিনতাই করে আলজিয়ার্সে নিযে যায়। বিমানটি লন্ডন থেকে রোমে যাচ্ছিল।

আলজিয়ার্সে নেওয়ার পর ইহুদি বাদে সব যাত্রীদের ছেড়ে দেওয়া হয়। এক সপ্তাহ বাদে ১২ ইসরায়েলি, ১০ নারী ও শিশুকে মুক্তি দেয় ছিনতাইকারীরা। ছিনতাইকারীদের মুক্তি দেওয়ার শর্তে অন্য সব আরোহীদের মুক্ত করতে ৪০ দিন লেগে যায়। ইসরায়েল ও আলজিয়ার্সের মধ্যে যুদ্ধের কারণে ওই ছিনতাই করা হয়।

ডসন’স ফিল্ড ছিনতাই (১৯৭০)
১৯৭০ সালে একই দিনে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্যা লিবারেশন অব প্যালেস্টাইন (পিএফএলপি)-এর সদস্যরা চারটি বিমান ছিনতাই করে। ফ্রাঙ্কফুট, জুরিখ, আমস্টারডাম থেকে নিউ ইয়র্কগামী তিনটি এবং বাহরাইন থেকে লন্ডনগামী একটি বিমান ছিনতাই করে তারা।

 

এর মধ্যে দুটি বিমান তারা জর্ডানের মরুভূমি অঞ্চল ডসন’স  ফিল্ডে নিতে সক্ষম হয়। ইহুদি যাত্রী ও বিমান ক্রুসহ ৫৬ জন বাদে ৩১০ আরোহীর সবাইকে ছেড়ে দেয় ছিনতাইকারীরা। বিমান দুটি তারা পুড়িয়ে দেয়। বেশ কিছু দিন পরে ওই ৫৬ জনকেও ছেড়ে দেয় ছিনতাইকারীরা।

এয়ার ফ্রান্স ফ্লাইট ১৩৯ (১৯৭৬)
ডসন’স ফিল্ডের ঘটনার ছয় বছর পর পিএফএলপির দুই সদস্য ও জার্মান রেভ্যুলিউশন সেলের দুই সদস্য মিলে এয়ার ফ্রান্সের ১৩৯ নম্বর ফ্লাইট ছিনতাই করে। তারা এথেন্স থেকে লন্ডনগামী বিমানটি ছিনতাই করে লিবিয়ার বেনগাজিতে নিয়ে যায়।

 

বেনগাজিতে এক নারী জিম্মিকে ছেড়ে দিয়ে ২৪৭ যাত্রী ও ১২ ক্রুসহ ছিনতাইকারীরা বিমানটি উগান্ডায় নিয়ে যায়। সেখানে আরো চার ছিনতাইকারী তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। ইসরায়েলে বন্দি ৪০ জন এবং অন্যান্য দেশে বন্দি ১৩ জনকে মুক্তি দাবি জানায় ছিনতাইকারীরা। না হলে সব আরোহীকে হত্যার হুমকি দেয় তারা।

 

শর্ত না মেনে ইসরায়েলের কমান্ডো বাহিনী এবং উগান্ডার বাহিনী মিলে ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। অভিযান শেষে বেঁচে ছিল ১০৫ জন যাত্রী।

লুফথানসা ফ্লাইট ১৮১ (১৯৭৭)
জার্মানির বিমান সংস্থা লুফথানসার ১৮১ নম্বর ফ্লাইট ছিনতাই করে পিএফএলপির চার সদস্য। বিমানে ৮৬ যাত্রী এবং পাঁচ ক্রু ছিলেন। এথেন্স থেকে প্যারিসগামী বিমানটি ছিনতাইকারীরা সাইপ্রাসের লারকানায় নিতে বলে। কিন্তু জ্বালানির জন্য বিমানটি রোমে অবতরণ করে।
পরে সাইপ্রাস, বাহরাইন, দুবাই, এডেন হয়ে মোগাদিসুতে নিয়ে যায় বিমানটি। জার্মানির সন্ত্রাসবিরোধী গ্রুপ জিএসজি-৯ অভিযানে দুই ছিনতাইকারী নিহত হয় এবং কয়েকজন আহত হয়। তবে ৮৬ যাত্রীর সবাই বেঁচে যান।

মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্স ফ্লাইট ৬৫৩ (১৯৭৭)
পেনাং থেকে কুয়ালালামপুরগামী মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের ৬৫৩ নম্বর ফ্লাইটটি ছিনতাইকারীদের শিকার হয়। কিন্তু প্রায় চার দশক পর আজো বিস্ময় হয়ে থেকে গেছে- কে বা কারা বিমানটি ছিনতাই করে। মালয়েশিয়ার তানজোং কুপাংয়ে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। বিমানটির ৯৩ আরোহী ও সাত ক্রুর সবাই নিহত হয়।

ইজিপ্ট এয়ার ফ্লাইট ৬৪৮ (১৯৮৫)
বিমান ছিনতাইয়ের ইতিহাসে চরম ভীতি সৃষ্টিকারী ছিনতাই ঘটনা এটি। এথেন্স থেকে কায়ারোগামী ইজিপ্ট এয়ারের ৬৪৮ নম্বর ফ্লাইট ছিনতাই করে ফিলিস্তিনপন্থি আবু নিদাল অরগানাইজেশনের কয়েক সদস্য। বিমানের ভেতরে গোলাগুলিতে কয়েকজন নিহত হয়। পরে বিমানটি মাল্টায় নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। কয়েক দিন পর সেখানে যাত্রীদের উদ্ধারে মিশর বাহিনীর অভিযানের সময় মোট ৯২ আরোহীর মধ্যে ৬০ জনই নিহত হয়।

ইরাকি এয়ারওয়েজ ফ্লাইট ১৬৩ (১৯৮৬)
হিজবুল্লাহ মিলিশিয়া বাহিনীর চার সদস্য ইরাকি এয়ারওয়েজের ১৬৩ নম্বর ফ্লাইটটি ছিনতাই করে। বাগদাদ থেকে আম্মানে যাচ্ছিল বিমানটি। ছিনতাইয়ের পর ৯১ আরোহী ও ১৫ ক্রু নিয়ে পাইলট বিমানটি নিরাপদে নেওয়ার চেষ্টা করলে ছিনতাইকারীরা বিমানের ককপিটে ও কেবিনে গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটায়। সৌদি আরবের আরারে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। ৬০ যাত্রী এবং তিন ক্রু নিহত হয়।

ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্স ফ্লাইট ৯৬১ (১৯৯৬)
ইথিপিওয়ার তিন নাগরিক অস্ট্রেলিয়ায় রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে ৯৬১ ফ্লাইট ছিনতাই করে। আদ্দিস আবাবা থেকে নাইরোবিগামী বিমানটি ছিনতাইকারীরা অস্ট্রেলিয়ায় নেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু সেখানে যাওয়ার মতো প্রয়োজনীয় জ্বালানি ছিল না। পরে বিমানটি নিয়ে কমোরোস দ্বীপে অবতরণের চেষ্টা করেন পাইলট। কিন্তু সে পর্যন্তও পৌঁছাতে পারেনি বিমানটি। তার আগেই বিধ্বস্ত হয়। এ ঘটনায় ১৭২ যাত্রীর মধ্যে ১২২ জনই নিহত হয়।