মিয়ানমার থেকে বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিজ দেশে টেকসই প্রত্যাবাসন এবং ভোলাসহ বঙ্গোপসাগরের সম্ভাবনাময় সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে চীনা বিনিয়োগের জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদ ভবনে স্পিকারের কার্যালয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের বিদায়ী রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন সৌজন্য সাক্ষাৎকালে তিনি এ আহ্বান জানান। বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধি, প্রযুক্তি খাত এবং আঞ্চলিক করিডোর গঠনসহ সার্বিক উন্নয়ন সহযোগিতার বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়।

স্পিকার বলেন, চীন বাংলাদেশের অন্যতম ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে দেশের সামগ্রিক অবকাঠামোগত ও সামাজিক উন্নয়নে সর্বতোভাবে সহযোগিতা দিয়ে আসছে। দুই দেশের ঐতিহাসিক সুসম্পর্কের প্রেক্ষাপট স্মরণ করে তিনি উল্লেখ করেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানই প্রথম বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক উন্নয়নে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া উভয় দেশের মধ্যে এই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ধারাবাহিক উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

স্বৈরাচারী শাসন ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা প্রসঙ্গে স্পিকার বলেন, বিগত সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, ব্যাপক অর্থ পাচার, গুম ও খুনের রাজনীতি এ দেশের মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করেছিল। তবে সর্বশেষ অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে পুনরায় জনগণের পছন্দ ও গণতন্ত্রের সঠিক ধারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জাতীয় সংসদের ভূমিকা তুলে ধরে তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সংসদীয় মৈত্রী গ্রুপ বাংলাদেশ ও চীনের সংসদীয় সম্পর্ককে আরও জোরদার করতে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশে অবস্থানরত বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে স্পিকার জানান, প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিজ দেশে প্রত্যাবাসন নিয়ে বাংলাদেশকে নানা ধরনের প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এই মানবিক সংকটের স্থায়ী সমাধানে এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে চীন সরকারের কার্যকর ও জোরালো সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

সৌজন্য সাক্ষাৎকালে চীনের বিদায়ী রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান সরকার জনগণের সরাসরি ম্যান্ডেট নিয়ে নির্বাচিত একটি গণতান্ত্রিক সরকার। সম্প্রতি বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও নতুন উচ্চতায় ও সমৃদ্ধিতে উন্নীত করেছে। তিনি জানান, চীন বাংলাদেশকে তার উন্নয়নের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার মনে করে। বাংলাদেশে চীনের বড় বড় মেগাপ্রকল্পের পাশাপাশি বর্তমানে মাঝারি ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগও কার্যকর রয়েছে বলে জানান তিনি।

রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, চীন সরকার বাংলাদেশকে এই ভূখণ্ডে একটি শক্তিশালী পণ্য উৎপাদনভিত্তিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে অত্যন্ত আগ্রহী। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) সহ বিভিন্ন ধরনের লজিস্টিক পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে আরও দ্রুত এগিয়ে যেতে পারে বলে মনে করে বেইজিং।

বৈঠকে উভয় পক্ষ দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বহুমাত্রিক আঞ্চলিক যোগাযোগের অংশ হিসেবে ‘বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন করিডোর’ স্থাপন, চলমান রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান এবং যৌথ জ্বালানি উদ্যোগ নিয়ে বিস্তারিত মতবিনিময় করেন।

স্পিকার পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এবং নীতিগতভাবে ‘ওয়ান চায়না পলিসি’ সমর্থন করে এবং ভবিষ্যতেও এ সমর্থন দৃঢ়ভাবে অব্যাহত থাকবে। স্পিকার ভোলাসহ বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলীয় সম্ভাবনাময় এলাকাগুলোতে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে চীনা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিনিয়োগের আমন্ত্রণ জানান। একই সঙ্গে ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ব্যারিস্টার জহরত আদিব চৌধুরীর প্রার্থিতায় চীন সরকারের সমর্থন কামনা করেন।

সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠানে চীনা দূতাবাসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট সব ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।