চার বছরের তুলনামূলক স্থিতির পর আবারও ভয়াবহ সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে ইয়েমেন। রাজধানী সানা দখলকারী হুথি গোষ্ঠী এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের অনুগত বাহিনীর মধ্যে সাম্প্রতিক লড়াই দেশটির দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এবারের সংঘাত কোনো দ্রুত সামরিক অভিযানে থেমে না গিয়ে নতুন করে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।  

আল জাজিরার ৮ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির পর ইয়েমেনে এটাই সবচেয়ে গুরুতর সংঘাতের পর্যায়। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তাইজ, আল-বায়দা ও আল-জাওফসহ বিভিন্ন এলাকায় লড়াই তীব্র হয়েছে। সরকারি বাহিনী দাবি করছে, তারা হুথিদের অবস্থানের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযান চালাচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত রাজধানী সানা পুনর্দখলের লক্ষ্য রয়েছে।

লোহিত সাগর কেন গুরুত্বপূর্ণ

নতুন সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চল ও লোহিত সাগরসংলগ্ন এলাকা। বিশেষ করে বাব আল-মান্দাব প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ। সেখানে অস্থিরতা বাড়লে শুধু ইয়েমেন বা সৌদি আরব নয়, আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ও বৈশ্বিক বাণিজ্যেও চাপ তৈরি হতে পারে।

ইয়েমেনের সংঘাতের সঙ্গে সৌদি আরবও সরাসরি জড়িয়ে পড়েছে। ৮ সেপ্টেম্বর হুথিরা সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি শহর ও জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালানোর দাবি করে। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এসব হামলায় ৭৩ জন আহত হয়েছেন এবং কয়েকটি জ্বালানি স্থাপনায় কার্যক্রম সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

কেন আবার উত্তপ্ত হলো ইয়েমেন?

ইয়েমেনে ২০১৪ সাল থেকে হুথি ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের মধ্যে সংঘাত চলছে। ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারি বাহিনীর পক্ষে যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করে। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতি সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক আঞ্চলিক উত্তেজনা, লোহিত সাগরের নিরাপত্তা সংকট এবং সৌদি-হুথি বিরোধ আবারও পরিস্থিতিকে বিস্ফোরণোন্মুখ করে তুলেছে।

এবার পরিস্থিতির আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো—ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের সঙ্গে বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের সংকটও একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে। ফলে স্থানীয় কোনো সামরিক সংঘর্ষ দ্রুত আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক নৌপথের সংকটে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

সামনে কী হতে পারে?

বিশ্লেষকদের মতে, সানা পুনর্দখলের চেষ্টা এবং লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব ঘিরে সামরিক চাপ—দুই দিকেই সংঘাত বাড়তে থাকলে ইয়েমেনে আবার পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হতে পারে। তবে সামরিকভাবে দ্রুত কোনো পক্ষের চূড়ান্ত বিজয় নিশ্চিত নয়; বরং শক্তির ভারসাম্য, আঞ্চলিক হস্তক্ষেপ এবং আন্তর্জাতিক চাপের ওপর নির্ভর করবে সংঘাতের পরবর্তী গতিপথ।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগ সাধারণ ইয়েমেনিদের নিয়ে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকটে থাকা দেশটিতে নতুন করে বড় আকারের সংঘাত শুরু হলে মানবিক সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই সানা ও লোহিত সাগর ঘিরে সামরিক উত্তেজনা শুধু ইয়েমেনের নতুন যুদ্ধ নয়—এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্যও নতুন বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।

সূত্র: আল জাজিরা, রয়টার্স ও এপি।