ফেনীর সোনাগাজীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায় ঘোষণা করা হবে সোমবার (২৪ আগস্ট)। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এ মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানি শেষে বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত একটি হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চে রায়ের এ দিন ধার্য করেন।
আসামিদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন), আপিল ও জেল আপিলের ওপর শুনানি গ্রহণ শেষে বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ এ দিন ঠিক করে আদেশ দেন।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ ইজাজ কবির। আসামি পক্ষে শুনানি করেন সিনিয়র আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী, এস এম শাহজাহান, এস এম মাসুদ হোসেন দোলন, মোহাম্মদ শিশির মনির ও অন্য আইনজীবীরা।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনসংক্রান্ত ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও বিবিধ বিষয়াদি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনতে গত ১০ জুন হাইকোর্টের সুনির্দিষ্ট ওই বেঞ্চ গঠন করে দেন প্রধান বিচারপতি। গঠিত দ্বৈত বেঞ্চটি গত ১৪ জুন থেকে কার্যক্রম শুরু করে। তারই ধারাবাহিকতায় এ বেঞ্চে চাঞ্চল্যকর ওই হত্যা মামলায় গত ২৮ জুলাই শুনানি শুরু হয়েছিল।
নথিপত্র অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে নুসরাতের শ্লীলতাহানি করেন। এ ঘটনায় থানায় অভিযোগ করলে তা তুলে না নেওয়ায় ৬ এপ্রিল মাদ্রাসার ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই বছরের ১০ এপ্রিল নুসরাতের মৃত্যু হয়। অগ্নিসন্ত্রাসের এ ঘটনায় নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান (নোমান) সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। পরে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।
আলোচিত ওই মামলায় ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর রায় দেন। রায়ে মাদ্রাসার বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাসহ ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
মৃত্যুদণ্ড পাওয়া অন্য আসামিরা হলেন, সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি রুহুল আমিন, সোনাগাজী পৌরসভার কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম, মাদ্রাসার শিক্ষক হাফেজ আবদুল কাদের, প্রভাষক আফসার উদ্দিন, মাদ্রাসার ছাত্র নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ যোবায়ের, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ, কামরুন নাহার মনি, উম্মে সুলতানা পপি ওরফে তুহিন, আবদুর রহিম শরিফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন মামুন, মোহাম্মদ শামীম ও মহি উদ্দিন শাকিল।
নুসরাত হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ের পর ডেথ রেফারেন্সের জন্য রায়সহ নথিপত্র ২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় এসে পৌঁছায়, যা ১৪০/১৯ ডেথ রেফারেন্স হিসেবে নম্বরভুক্ত হয়। চাঞ্চল্যকর মামলা হিসেবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ডেথ রেফারেন্সের জন্য পেপারবুক তৈরি করা হয়। আসামিরাও পৃথক আপিল ও জেল আপিল করেন। এসবের ওপর একসঙ্গে শুনানি শেষে সোমবার মামলাটি রায় ঘোষণার দিন ধার্য করা হয়।
নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের পর থেকে দীর্ঘ লড়াই শেষে রায়ের দিন ধার্য হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন নুসরাতের মা শিরিন আক্তার। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, নিম্ন আদালতের দেওয়া দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি উচ্চ আদালতেও বহাল থাকবে এবং তাদের পরিবার দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পূর্ণ ন্যায়বিচার পাবে।
মেয়ের বিচারে আদালতের প্রতি আস্থা প্রকাশের পাশাপাশি বেঁচে থাকা অন্য সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নুসরাতের মা। তিনি বলেন, প্রভাবশালী মহলের নানা হুমকি ও মামলার বাদী-সাক্ষী হিসেবে পরিবারের সদস্যরা জড়িত থাকায় প্রতিমুহূর্তে এক অদৃশ্য ভয়ের মধ্যে থাকতে হচ্ছে। অপরাধীদের সহযোগীরা যেকোনো সময় প্রতিশোধ নিতে পারে—এমন আশঙ্কায় ছেলেদের নিরাপত্তা নিয়ে তিনি শঙ্কিত এবং সরকারের কাছে স্থায়ী ও নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।