প্রিয় আলো বিশেষ: শিক্ষকতা ছেড়ে রাজনীতিতে এলেন, দেখলেন, মানুষের মন জয় করলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ১৯৮৬ সালের কথা। শিক্ষকতা পেশা থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি নিয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে আত্মনিয়োগ করলেন। ১৮৮৮ সালে নিজের জন্মস্থান ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার মধ্যদিয়ে তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা শুরু।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জনের পর ১৯৭২ সালে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারভুক্ত হয়ে তিনি ঢাকা কলেজ, দিনাজপুর সরকারি কলেজ ও ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেছেন বেশ কয়েক বছর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ণকালীন তিনি ১৯৬৯ সালে পূর্বপাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
তৎকালীন সময়ে ছাত্ররাজনীতির পাশাপাশি নাট্যচর্চা, অভিনয়, খেলাধূলা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গণেও তিনি এগিয়েছিলেন অনেকখানি। এরশাদ সরকার বিরোধী আন্দোলনের শেষদিকে নব্বই দশকে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি’র অন্যতম প্রধান নীতিনির্ধারক হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ১৯৪৮ সালে ২৬ জানুয়ারিতে ঠাকুরগাঁও জেলার সম্ভ্রান্ত এক রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম নেওয়া এই কৃতি সন্তান। তাঁর পিতা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন প্রখ্যাত আইনজীবী ও সাবেক সংসদ সদস্য এবং সাবেক কৃষিমন্ত্রী। তাঁর চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ছিলেন বিএনপির রাজনীতিক- যিনি ১৯৭৮-৭৯ সাল পর্যন্ত ভূমিমন্ত্রী, ১৯৯১-৯৬ সাল পর্যন্ত আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী, ১৯৭৯-৮২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং ১৯৭৯ সালে ঢাকার একটি আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য। তাঁর আরেক চাচা উইং কমান্ডার এস আর মির্জা ১৯৭১ সালে এপ্রিলে গঠিত মুজিব নগর প্রবাসী সরকারে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১- ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি প্রথমে কৃষি প্রতিমন্ত্রী ও পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালে তিনি নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত বিএনপির ৫ম জাতীয় কাউন্সিলে তাঁকে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব প্রদান করা হয়।
বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর ২০১১ সালের ২০ মার্চ অত্যন্ত প্রতিকুল রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্যে তাঁকে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব প্রদান করা হয়, সেই থেকে পাঁচ বছর এবং পরে দলের সংকটকালীন সময়ে ২০১৬ সালের ৩০ মার্চে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে তাঁকে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিবের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। সেই থেকে তিনি স্বপদে নিজের মর্যাদা ধরে রেখে বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সুপরিকল্পিত পরামর্শক্রমে দলের চরম দুর্দিনে দলের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদেরকে হতাশার মাঝে আশার আলো জ্বালিয়ে সুদীর্ঘ ১৫ বছরে বিএনপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন বহুদূর। বিএনপি মহাসচিবের দায়িত্বে এতো সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতা ইতোপূর্ব লক্ষ্য করা যায়নি।
অতীতে আবদুল মান্নার ভূঁইয়া ৯ বছর, আবদুস সালাম তালুকদার ৮ বছর, এ কে এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ৭ বছর, খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন ৪ বছর, কে এম ওবায়দুর রহমান ২ বছর ও এস এম মোস্তাফিজুর রহমানের মহাসচিবের মেয়াদকাল ছিল ১ বছর। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজ জেলা ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে ১৯৯৬ সালে, ২০০১ সালে, ২০১৮ সালে এবং ২০২৬ সালে মোট চারবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
বর্তমানে তিনি জাতীয় সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের মহাসচিব এবং বাংলাদেশ সরকারের স্থানীয় সরকার,পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। ১৩ আগস্ট ২০২৬ শ্রাবণের মেঘলা মেদুর দুপুরে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যগণের উপস্থিতিতে বাংলাদেশের ২৩ তম রাষ্ট্রপতির পদে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রার্থীতা চূড়ান্ত করেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেতা তারেক রহমান। জেল-জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হওয়া সুদীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রজ্ঞাময় বর্ষীয়ান এই ত্যাগী রাজনৈতিক যোদ্ধাকে যথাযথ মূল্যায়ণ করায় দলের অভ্যন্তরে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন বৈকি।
রাজনৈতিক সঠিক মূল্যায়ণের এই দৃষ্টান্তে তাঁর নিজদলের ত্যাগী নেতা-কর্মীরা আরও উচ্ছ্বাসীত ও উজ্জীবিত হবে সুষ্ঠু রাজনৈতিক চর্চায়। রাষ্ট্র ক্ষমতাসীন দলের সুযোগ্য চেয়ারম্যানের হাত থেকে মনোনয়নপত্র গ্রহণ ও ইসি সচিবালয়ে মনোনয়নপত্র জমাদানের মধ্য দিয়ে বঙ্গভবনের পথে যাত্রা– নাট্যমঞ্চ, শিক্ষকতা ও শিষ্টাচার রাজনীতির মাঠ কাঁপানো সারথি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এমপি’র।
তাঁর বঙ্গভবনের এই যাত্রায় রাজপথের সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রাম হারাবে একজন রাজনৈতিক শিষ্টাচার সমৃদ্ধ রাজনীতিক। আনুষ্ঠানিক সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষণ পর্যন্ত দলের নেতা-কর্মী-সমর্থকরা অপেক্ষমান থাকলেও ইতোমধ্যে বাংলাদেশের ২৩ তম রাষ্ট্রপতি হিসাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম ছড়িয়ে গেল সুজলা-সুফলা-শষ্য-শ্যামলা প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের দশদিগন্তে।
চলতি বছরের ২৪ জুলাই সদ্য সাবেক ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের স্বেচ্ছায় পদত্যাগের মধ্য দিয়ে ১৯৯১ সালের পর দীর্ঘবিরতি শেষে ৩৫ বছর পরে আবারও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ২০ আগস্ট সংসদ অধিবেশন কক্ষে ভোটাভুটি, ভোট গণনা ও ফলাফল গণমাধ্যমে সরাসরি প্রত্যক্ষ করবেন দেশবাসী।
সরাসরি ভোট প্রদান করবেন ৩৪৯টি ব্যালটে ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য। ক্ষমতাসীন বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য ২৪৭ জন সেই সঙ্গে তাদের মিত্ররাতো রয়েছেই। বাকী সংসদ সদস্য বিরোধীদল ও তাদের মিত্রদের। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যও রয়েছে।
আনুষ্ঠানিক ভোটের মাধ্যমে চুড়ান্ত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের ২৩ তম রাষ্ট্রপতি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ভিন্ন ভিন্ন ২২ মেয়াদে রাষ্ট্রপতির দায়িত্বপালন করেন ১৮ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি। তাঁরা হলেন- শেখ মুজিবুর রহমান, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, আবু সাঈদ চৌধুরী, মোহাম্মদ উল্লাহ, খন্দকার মোশতাক আহমেদ, আবু সাদত মোহাম্নদ সায়েম, জিয়াউর রহমান, আবদুস সাত্তার, আ ফ ম আহসান উদ্দিন চৌধুরী, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, শাহাবুদ্দিন আহমেদ, আবদুর রহমান বিশ্বাস, এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, জমির উদ্দিন সরকার, ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ, জিল্লুর রহমান, আবদুল হামিদ, মো. সাহাবুদ্দিন, ( ১৮ তম)। হাফিজ উদ্দিন আহমদ (ভারপ্রাপ্ত)। সেই হিসাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর হতে যাচ্ছেন ১৯তম বিশিষ্ট ব্যক্তি।
তৃণমূল রাজনীতির উঠান থেকে ওঠে আসা এমনি একজন শিষ্টাচার রাজনৈতিকবোধ সম্পন্ন সজ্জন, সহনশীল ও নির্লোভী রাজনীতিককে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে প্রত্যাশা করেছিল দেশবাসী। দেশবাসীর সেই প্রত্যাশাকে যথাযথ মূল্যায়ন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিগত বছরগুলোতে দলের প্রতিকুল সময়ে তারেক রহমানের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দর্শন, দূরদর্শিতা ও তারুণ্যনির্ভর সময়োপযোগী সঠিক সিদ্ধান্তের ফলেই বিএনপি আজ রাষ্ট্র ক্ষমতাসীন। নিজ দলীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তিনি তরুণদের যেমন প্রাধান্য দেন তেমনি ত্যাগী ও বর্ষীয়ান নেতাদের সম্মান ও মূল্যায়ণ করতে সদা সচেতন। ৭৮ বছর বয়সী ত্যাগী নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে যথাযথ মূল্যায়নই তার প্রমাণ মেলে। দলের ভেতর সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক চর্চায় দলের শীর্ষ নেতা তারেক রহমানের অসাধারণ ভুমিকা, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কর্মমুখী রাজনীতি ও স্বল্প সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার ইতিবাচক দর্শনের নানাবিধ সুফল দেশবাসী ইতোমধ্যে লক্ষ্য করছেন। দলের নেতাকর্মীদের মনোবল ধরে রাখা, দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়ার অসাধারণ ক্যারিমাটিক পাওয়ারের কারণেই তাঁর দল ও অনুসারীদের কাছে তিনি যারপরনাই সমাদৃত। ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ এমন নীতিই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে প্রত্যাশা করেন দেশবাসী।

লেখক : সামছুদ্দোহা সোহাগ, সম্পাদক, আজকের সূর্যোদয়