তৈরি পোশাকনির্ভর রপ্তানি থেকে বেরিয়ে নতুন সম্ভাবনাময় খাত গড়ে তুলতে হালাল অর্থনীতির দিকে বাংলাদেশের নজর দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, আসিয়ান অঞ্চলের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে একটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হালাল ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে পারলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক হালাল সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠতে পারে।

বুধবার (১২ আগস্ট) বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) আয়োজিত ‘আসিয়ান অঞ্চলে হালাল ইকোসিস্টেম: বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনা’ শীর্ষক সেমিনারে এ বিষয়টি উঠে আসে।

সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ‍“প্রচলিত রপ্তানি পণ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন সম্ভাবনাময় খাতের দিকে নজর দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে আসিয়ান অঞ্চলের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হালাল ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে পারে।”

তিনি বলেন, “হালাল অর্থনীতিকে শুধু খাদ্য ও পানীয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই। বর্তমানে খাদ্য, ওষুধ, প্রসাধনী, মোডেস্ট ফ্যাশন, পর্যটন, লজিস্টিকস, প্রযুক্তি, অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন- সব মিলিয়ে এটি একটি বড় বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, “রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য প্রথমে আমাদের নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। এজন্য দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি নিরাপদ ও আকর্ষণীয় পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।”

খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, “বৈশ্বিক বাজারে অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার বিনিয়োগ আকর্ষণের অন্যতম প্রধান শর্ত। এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশের রপ্তানি সুবিধা ধরে রাখতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) এবং অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।”

হালাল পণ্যের বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন বাণিজ্যমন্ত্রী।

তিনি বলেন, “দেশে একটি স্বাধীন, নির্ভরযোগ্য ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হালাল সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের পণ্যের প্রতি বৈশ্বিক আস্থা বাড়বে এবং নতুন বাজার তৈরির সুযোগ তৈরি হবে।”

সেমিনারে অন্য বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের রপ্তানি খাত দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাকনির্ভর। ভবিষ্যতের বৈশ্বিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে হলে পণ্য ও বাজার- দুই ক্ষেত্রেই বহুমুখীকরণ করতে হবে। হালাল অর্থনীতি সেই নতুন সম্ভাবনার অন্যতম বড় ক্ষেত্র হতে পারে।

মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর পরামর্শ
আলোচনায় আসিয়ান অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে মালয়েশিয়ার হালাল ইকোসিস্টেমকে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়।

বক্তারা বলেন, মালয়েশিয়া হালালকে শুধু একটি পণ্য হিসেবে দেখেনি। উৎপাদন, গবেষণা, সার্টিফিকেশন, বিপণন ও রপ্তানিকে সমন্বয় করে তারা একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশের জন্যও এ ধরনের সমন্বিত কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

বাংলাদেশের বড় অভ্যন্তরীণ বাজারের পাশাপাশি কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ওষুধ, চামড়া ও পোশাকশিল্পে বিদ্যমান সক্ষমতা রয়েছে। এসব খাতের সঙ্গে হালাল মান ও সার্টিফিকেশন যুক্ত করে বৈশ্বিক বাজারে নতুন রপ্তানি সুযোগ তৈরি করা সম্ভব বলে মনে করছেন আলোচকরা।

পাঁচ অগ্রাধিকার
বাংলাদেশের হালাল খাতকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার উপযোগী করতে সেমিনারে পাঁচটি কৌশলগত অগ্রাধিকার তুলে ধরা হয়।

এগুলো হলো- আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য জাতীয় হালাল নিশ্চয়তা কাঠামো তৈরি; আধুনিক পরীক্ষাগার ও উন্নত লজিস্টিক সুবিধাসহ বিশেষায়িত হালাল শিল্প ক্লাস্টার গড়ে তোলা; বিদ্যমান উৎপাদন খাতকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা; এসএমই, গবেষক ও তরুণ উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করা এবং অর্থনৈতিক কূটনীতির মাধ্যমে ‘বাংলাদেশ হালাল ব্র্যান্ড’কে বিশ্ববাজারে প্রতিষ্ঠা করা।

বিআইআইএসএসের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এ এস এম রেদওয়ানুর রহমান সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইআইএসএসের গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবীর।

প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের হালাল সার্টিফিকেশন (লাইভস্টক) বিভাগের উপ-পরিচালক আকতার হোসেন এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) উপ-পরিচালক (হালাল সার্টিফিকেশন) এস এম আবু সাঈদ।