গত সাড়ে ৬ বছরে দেশে ১৬ হাজার ৬৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে তথ্য পেয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। ২০২০ থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত এসব দুর্ঘটনায় সড়কে ঝরে গেছে ১৫ হাজার ৭১২ হাজার প্রাণ; আর আহত হয়েছেন ১৪ হাজার ১৪৩ জন। নিহতদের বড় একটি অংশই কিশোর ও তরুণ। আর আহতদের অর্ধেকের বেশির বয়স ১৩ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে।
শনিবার (৮ আগস্ট) রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে পাঠানো প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমনই তথ্য।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার ৩৯.৩০ শতাংশই ঘটেছে ভারী যানবাহনের ধাক্কায়। আর ৩৪.২১ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে।
প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী করা হয়েছে পণ্যবাহী যানবাহনকে। আর অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে কিশোর-যুবকদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানোর প্রবণতাকে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনায় আক্রান্তদের ৫৮ শতাংশের বয়স ১৩ থেকে ৩৫ বছর। সংস্থাটি বলছে, চার চাকার অন্যান্য যানবাহনের তুলনায় মোটরসাইকেল ৩০ গুণ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু, দেশে গণপরিবহন ব্যবস্থা উন্নত ও সহজলভ্য না হওয়া এবং যানজটের কারণে মানুষ মোটরসাইকেল ব্যবহারে উৎসাহিত হচ্ছেন। ফলে দুর্ঘটনাও বাড়ছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন জানায়, প্রধানত বেপরোয়া চালানো, ট্রাফিক আইন না মানা ও আইন প্রয়োগে দুর্বলতার কারণেই বাড়ছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা। এ কারণে মানসম্পন্ন হেলমেট, কঠোর আইন প্রয়োগ ও নিরাপত্তা প্রযুক্তি ব্যবহারের সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণ করে সংস্থাটি জানিয়েছে, ২২ শতাংশ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে মুখোমুখি সংঘর্ষের কারণে। ৩৪ শতাংশের বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে। আর ৩৯ শতাংশের বেশি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে ভারী যানবাহনের ধাক্কায়।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দুর্ঘটনার জন্য মোটরসাইকেলের চালক এককভাবে দায়ী ৩৬ শতাংশের বেশি। পণ্যবাহী যানবাহনের কারণে ৪০ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে। বাসের চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে প্রায় সাড়ে ১৩ শতাংশ।
গত সাড়ে ৬ বছরে ঘটে যাওয়া মোটরসাইকেল দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে জাতীয় মহাসড়কে ঘটেছে প্রায় ৩০ শতাংশ। আঞ্চলিক সড়কে ৪২, গ্রামীণ সড়কে ১২ শতাংশ এবং শহরের সাড়ে ১৬ শতাংশ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলছে, বাংলাদেশে নিবন্ধিত মোট মোটরযানের ৭১ শতাংশ মোটরসাইকেল। যার একটি বড় অংশ কিশোর-যুবকেরা চালায়। কিশোর-যুবকদের মধ্যে বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানোর প্রবণতা বাড়ছে। এক্ষেত্রে মোটরসাইকেল উৎপাদন ও বিপণন প্রতিষ্ঠানগুলোর বিজ্ঞাপনের ভাষা-ভঙ্গি কিশোর–যুবকদের অতিরিক্ত গতিতে মোটরসাইকেলের প্রতি আকর্ষণ বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি গতি তুলতে উৎসাহিত করছে।
সংস্থাটি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার যেসব কারণ পেয়েছে এর মধ্যে রয়েছে কিশোর-যুবকদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা, রাজনীতিতে বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানোর সংস্কৃতি, ট্রাফিক আইনের দুর্বল প্রয়োগ, সচেতনতামূলক কর্মসূচি না থাকা, ত্রুটিপূর্ণ ও দুর্বল সড়ক অবকাঠামো, প্রযুক্তির ব্যবহার ও নজরদারির অভাব, সহজ-সাশ্রয়ী গণপরিবহনের ঘাটতি এবং অসহনীয় যানজট।
দুর্ঘটনা কমাতে সংস্থাটির সুপারিশ হচ্ছে মোটরসাইকেলে নিরাপত্তা ও নজরদারি প্রযুক্তির ব্যবহার করতে হবে, মানসম্পন্ন হেলমেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে, ট্রাফিক আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিতকরতে হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করতে হবে, বিটিআরসির মাধ্যমে সামাজিকযোগাযোগমাধ্যমে নিরাপত্তামূলক প্রচারণা চালাতে হবে, মোটরসাইকেলের বিজ্ঞাপনের ভাষাভঙ্গি পরিবর্তন আনতে হবে, নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে এবং সহজ-সাশ্রয়ী যাত্রীবান্ধব গণপরিবহন চালু করতে হবে।