মানবপাচার এবং প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ থেকে দেশের নাগরিকদের সুরক্ষায় বর্তমান সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, প্রযুক্তির অপব্যবহার করে গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক মানবপাচার ও স্ক্যাম চক্রের বিরুদ্ধে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বজায় রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) রাজধানীর এক হোটেলে ‘বিশ্ব মানবপাচার বিরোধী দিবস ২০২৬’—উপলক্ষে আয়োজিত ‘ট্র্যাপড বিহাইন্ড দ্য স্ক্যাম: এন্ডিং হিউম্যান ট্রাফিকিং ফর ফোর্সড ক্রিমিনালিটি’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের জাতীয় সংলাপে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, মানবপাচারের ধরন পরিবর্তনশীল ও জটিল। অপরাধী চক্রগুলো এখন শুধু প্রচলিত উপায়ে নয়, ডিজিটাল মাধ্যম, ভুয়া অনলাইন নিয়োগ প্ল্যাটফর্ম এবং বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে তরুণ সমাজ ও চাকরিপ্রার্থীদের ফাঁদে ফেলছে।
আকর্ষণীয় কর্মসংস্থান ও উন্নত ভবিষ্যতের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে ভুক্তভোগীদের বিদেশে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পরে তাদের সাইবার স্ক্যাম সেন্টারে বন্দি করে চরম নির্যাতন, ভয়ভীতি ও জোরপূর্বক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে বাধ্য করা হচ্ছে।
মানবপাচার চক্রের প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রসঙ্গ তুলে মন্ত্রী বলেন, এই হুমকি মোকাবিলায় শুধু প্রথাগত আইনশৃঙ্খলাভিত্তিক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, অর্থলগ্নি সংস্থা, বেসরকারি খাত ও সচেতন সমাজকে সঙ্গে নিয়ে সমন্বিত ও শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সরকার ‘মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান (প্রতিরোধ ও দমন) আইন, ২০২৬’ প্রণয়ন করেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, জাতিসংঘের ট্রান্সন্যাশনাল অর্গানাইজড ক্রাইম কনভেনশন (ইউএনটিওসি) এবং সংশ্লিষ্ট প্রটোকলসমূহের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রণীত এ আইনে অনলাইন স্ক্যাম, প্রযুক্তিনির্ভর প্রলোভন এবং জোরপূর্বক অপরাধে বাধ্য করার মতো আধুনিক অপরাধগুলোকে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে।
বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া জোরদারে ‘মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন বিধিমালা, ২০১৭’ যুগোপযোগী করার কাজ চলছে বলেও জানান তিনি। পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ‘জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (২০২৬-২০৩০) ’ চূড়ান্ত করছে, যা প্রতিরোধ, সুরক্ষা, বিচার ও অংশীদারিত্ব—এই চার প্রধান স্তম্ভকে আরও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাবে।
ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা ও পুনর্বাসনের বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, মানবপাচারের শিকার প্রতিটি মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব। এ জন্য ‘ন্যাশনাল রেফারেল মেকানিজম (এনআরএম) ’ জোরদার করা হচ্ছে, যাতে ভুক্তভোগীদের দ্রুত উদ্ধার করে তাৎক্ষণিক আইনি, শারীরিক, মনস্তাত্ত্বিক ও পুনর্বাসন সহায়তা দেওয়া যায়।
তথ্যভিত্তিক নীতি নির্ধারণ এবং নিখুঁত কেস ট্র্যাকিং নিশ্চিত করতে একটি সর্বাধুনিক ‘ডিজিটাল পাচার প্রতিরোধ তথ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যাটফর্ম’ তৈরি করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
তরুণ সমাজ, নারী ও অভিবাসনপ্রত্যাশীদের নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিতকরণ এবং ভুয়া নিয়োগ চক্রের বিরুদ্ধে ব্যাপক জনসচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের প্রতি আহ্বান জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংলাপে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন আইন ও বিচার বিভাগের সচিব মো. লিয়াকত আলী মোল্লা, বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক মো. আলী হোসেন ফকির, ইউরোপীয় ইউনিয়নের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স বাইবা জারিনা এবং আইওএম বাংলাদেশ-এর চিফ অব মিশন ও জাতিসংঘের অভিবাসন নেটওয়ার্কের সমন্বয়কারী ড. লরা টম বোন্ডে।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের মহাপরিচালক রিয়ার এডমিরাল মো. জিয়াউল হক এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সোহরাব হোসেন ভূঁইয়া এনডিসি।