ভারতের সঙ্গে আন্তর্জাতিক চুক্তির অধীনে বরাদ্দকৃত পানির অংশ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করলে পাকিস্তান সেই হাত কেটে ফেলার হুমকি দিয়েছে। দেশটি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী পাকিস্তানের প্রাপ্য পানির প্রবাহ বন্ধ করার চেষ্টা করলে সেই ‘হাত কেটে ফেলা হবে’। একইসঙ্গে ভারত পানিকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে বলেও অভিযোগ করেছে পাকিস্তান।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট বলছে, ভারত ও পাকিস্তান ভৌগোলিকভাবে হিমালয়, তিব্বত মালভূমি এবং পির পাঞ্জাল পর্বতমালা থেকে উৎপন্ন ছয়টি নদীর পানি ভাগাভাগি করে। এসব নদীর উৎস তিব্বত, লাদাখ, জম্মু ও কাশ্মীর এবং ভারতের হিমাচল প্রদেশ অঞ্চলে।

দেশভাগের পর দুই দেশ নদীর পানি বণ্টন নিয়ে বিশ্বের অন্যতম সফল চুক্তিগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত ‘সিন্ধু পানি চুক্তি’ স্বাক্ষর করে। উভয় দেশের পানির সরবরাহ নিশ্চিত করাই ছিল এই চুক্তির লক্ষ্য। তবে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক উত্তেজনার কারণে এখন এই চুক্তি নতুন করে পরীক্ষার মুখে পড়েছে।

এমন অবস্থায় মঙ্গলবার (৩০ জুন) এক সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী মুসাদিক মালিক বলেন, ‘আমরা ঘোষণা করেছি, আমাদের পানি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে সেই হাত কেটে ফেলা হবে। শুধু ঘোষণাই দিইনি, গত এক থেকে দেড় বছরে সেটি করে দেখিয়েছিও’।

ভারত পাকিস্তানে এক ফোঁটা পানিও যেতে দেবে না বলে নয়াদিল্লির সাম্প্রতিক বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানের জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী এ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, বিষয়টি শুধু ন্যায়বিচারের নয়। মুসাদিক মালিক বলেন, ‘আমাদের সামরিক বাহিনীও দেখিয়ে দিয়েছে যে শুধু পানির ক্ষেত্রেই নয়, আকাশযুদ্ধেও আমরা তোমাদের হাত কেটে দিতে পারি।’

তিনি গত বছরের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চার দিনের তুমুল সংঘর্ষের প্রসঙ্গ টেনে একথা বলেন। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের প্রতিবেশী দেশের প্রধানমন্ত্রীর হাতে একটি কলের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তিনি বলছেন, পাকিস্তানে এক ফোঁটা পানিও যেতে দেবেন না।’

এছাড়া তিনি জুন মাসের শুরুতে ভারতের পানিসম্পদমন্ত্রী সি. আর. পাতিলের একটি মন্তব্যের কথাও উল্লেখ করেন। সি. আর. পাতিল বলেছিলেন, গত বছর কাশ্মীরে হামলার পর ভারত সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত করেছে। এরপর থেকে পাকিস্তানে ‘এক ফোঁটা পানিও’ যেতে না দেয়ার জন্য সরকার কাজ করছে। ওই হামলার জেরে দুই দেশ প্রায় পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল।

পাকিস্তানের মন্ত্রী আরও বলেন, দেশের ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ মানুষ কৃষিকাজের জন্য এই পানির ওপর নির্ভরশীল। পানির প্রবাহে বাধা দেয়া হলে খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট বলছে, বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় হওয়া সিন্ধু পানি চুক্তির আওতায় সিন্ধু অববাহিকার ছয়টি নদীর পানি দুই দেশের মধ্যে বণ্টন করা হয়। চুক্তি অনুযায়ী, পশ্চিমাঞ্চলের তিনটি নদী— সিন্ধু, ঝিলাম ও চেনাবের পানির অধিকার পাকিস্তানের। আর পূর্বাঞ্চলের তিনটি নদী— রাভি, বিয়াস ও শতদ্রুর পানির অধিকার ভারতের।

ভারতের উৎস থেকে আসা এই নদীগুলোর পানি পাকিস্তানের লাখো মানুষের জীবন ও জীবিকার প্রধান ভরসা। জলবিদ্যুৎ উৎপাদন, সুপেয় পানি সরবরাহ এবং কৃষিকাজে এই পানির ওপর দেশটি ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

চুক্তি অনুযায়ী, ভারতকে প্রতি বছর ৪ কোটি ৩০ লাখ একর-ফুট পানি পাকিস্তানে প্রবাহিত হতে দিতে হয়। এটি পাকিস্তানের মোট ভূ-পৃষ্ঠস্থ পানির প্রায় ৮০ শতাংশ এবং তা দেশটির কৃষি, নগরজীবন ও জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পাকিস্তান অভিযোগ করেছে, ভারত পানিকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। সীমান্তবর্তী নদীগুলোর পানির স্বাভাবিক প্রবাহ পরিবর্তনের যেকোনও প্রচেষ্টাকে তারা ‘যুদ্ধ ঘোষণা’ হিসেবে বিবেচনা করবে বলেও জানিয়ে দিয়েছে।

এ ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সমর্থন জোরদার করতে মঙ্গলবার সিন্ধু পানি চুক্তি নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করে পাকিস্তান। সেখানে এসব নদীর পানির ওপর পাকিস্তানের ‘অধিকার’ নিয়ে আলোচনা করতে পানি ও আন্তর্জাতিক আইনবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন।

সম্মেলনে মূল বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের। এরপর দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা চুক্তির আইনি ভিত্তি, আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপর এর প্রভাব এবং সংঘাত প্রতিরোধের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করবেন।