দেশের বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী, পাপেটশিল্পের পথিকৃৎ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুস্তাফা মনোয়ারকে রাজধানীর বনানী কবরস্থানে দাফন করা হবে।

অভিনয়শিল্পী সংঘের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ মামুন অপু জানিয়েছেন, মঙ্গলবার (৩০ জুন) বনানী কবরস্থানে তাঁর দাফন সম্পন্ন হবে।

তিনি জানান, সোমবার (২৯ জুন) মুস্তাফা মনোয়ারের মরদেহ স্কয়ার হাসপাতালে রাখা হবে। মঙ্গলবার (৩০ জুন) সকাল ৯টায় বাংলাদেশ টেলিভিশন, রামপুরা প্রাঙ্গণে প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।

এরপর সকাল ১১টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য মরদেহ রাখা হবে। বাদ জোহর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে দ্বিতীয় জানাজা শেষে চারুকলা অনুষদে সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীরা শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন। পরে বনানী কবরস্থানে তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে।

গত ১৪ জুন নিউমোনিয়াজনিত জটিলতায় হাসপাতালে ভর্তি হন মুস্তাফা মনোয়ার। অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকদের পরামর্শে তাঁকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন ছিলেন। সোমবার (২৯ জুন) সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯১ বছর।

পরিবার জানায়, প্রায় দুই বছর ধরে বয়সজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন এই শিল্পী। এ সময়ে কয়েকবার তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি হলে তাঁকে লাইফ সাপোর্টেও রাখা হয়। পরে কিছুটা সুস্থ হলেও এবার নিউমোনিয়ার সংক্রমণ তাঁর অবস্থা আরও জটিল করে তোলে।

১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন যশোর জেলার নাকোল গ্রামে জন্ম নেন মুস্তাফা মনোয়ার। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফা ও জমিলা খাতুন দম্পতির ছয় সন্তানের মধ্যে সবার ছোট। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে মাকে হারান তিনি।

কলকাতার গভর্নমেন্ট কলেজ অব আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট থেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে পড়াশোনা শেষ করেন। সেখানেই পাপেটশিল্পের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ তৈরি হয়, যা পরে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নতুন অধ্যায় যোগ করে।

কর্মজীবনের শুরুতে তৎকালীন আর্ট কলেজে শিক্ষকতা করেন তিনি। পরে বাংলাদেশ টেলিভিশনের উপ-মহাপরিচালক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক এবং বিএফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

চিত্রকলা, পাপেটশিল্প, শিশুতোষ সংস্কৃতি ও টেলিভিশনে তাঁর অবদান অনন্য। বিশেষ করে বিটিভিতে শিশুদের জন্য তৈরি পাপেটভিত্তিক অনুষ্ঠানগুলো কয়েক প্রজন্মের শৈশব রঙিন করেছে। তাঁর সৃজনশীলতা ও শিল্পচর্চা কয়েক দশক ধরে দেশের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে।

শিল্প-সংস্কৃতিতে অবদানের জন্য ২০০৪ সালে তিনি একুশে পদক পান। এছাড়া ২০১৮ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি তাঁকে ‘সুলতান স্বর্ণপদক’ সম্মাননা দেয়।

ব্যক্তিজীবনে ১৯৬৫ সালে মেরী মনোয়ারের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। স্ত্রী, ছেলে সাদাত মনোয়ার, মেয়ে নন্দিনী মনোয়ারসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী, সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ী রেখে গেছেন। তাঁর মৃত্যুতে দেশের শিল্প, সংস্কৃতি ও গণমাধ্যম অঙ্গনে গভীর শোক নেমে এসেছে।