সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার পর নতুন করে পারমাণবিক ইস্যু সামনে এসেছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স দাবি করেছেন, ইরান আন্তর্জাতিক পরমাণু পরিদর্শকদের দেশটিতে প্রবেশের অনুমতি দিতে রাজি হয়েছে। তবে তেহরান এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পরিদর্শনের বিষয়ে নতুন কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়নি।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এমন এক সময়ে এই ঘটনা ঘটল যখন যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে, যার ফলে গত কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো ইরান মার্কিন ডলারে তেল বিক্রি করার অনুমতি পাচ্ছে।
সোমবার (২২ জুন) মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতার ও পাকিস্তানের পক্ষ থেকে জারি করা একটি যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টক রিসোর্টে প্রথম দফা আলোচনার পর, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ‘৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য একটি রোডম্যাপে’ সম্মত হয়েছে।
ভ্যান্স এই আলোচনাকে একটি ‘খুব ভালো ভিত্তি’ তৈরি করেছে বলে বর্ণনা করেছেন।
মার্কিন ভাইস-প্রেসিডেন্ট বলেন, প্রতিনিধি দলগুলো হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং ‘আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতির জন্য সংঘাত এড়ানো’ নিয়ে আলোচনা করেছে।
এরপরপরই সোমবার মার্কিন অর্থ বিভাগ ইরানের ওপর থেকে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ৬০ দিনের জন্য শিথিল করার ঘোষণা দিয়েছে। আগামী ২১ আগস্ট পর্যন্ত কার্যকর থাকা এই জরুরি লাইসেন্সের আওতায় গত কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো ইরান মার্কিন ডলারে সরাসরি অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল বিক্রি করতে পারবে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, এই ৬০ দিনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে তেহরান গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখতে এবং আইএইএ পরমাণু পরিদর্শকদের দেশে ফিরে আসার অনুমতি দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে।
সোমবার সকালে সুইজারল্যান্ডে সাংবাদিকরা মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সের কাছে জানতে চান, পরমাণু পরিদর্শকরা কবে নাগাদ ইরানে ফিরবেন।
তিনি বলেন, তিনি আশা করছেন এই প্রক্রিয়া ‘কমপক্ষে এই সপ্তাহের মধ্যে’ শুরু হবে, তবে পরিদর্শকদের সঙ্গে আলোচনা ‘আজকের মধ্যেই হতে পারে’।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছেন যে, ইরান ‘বড় ধরনের অস্ত্র পরিদর্শনে সম্মত হবে’।
তবে ইরানি রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ‘ইরনা’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, পরমাণু পরিদর্শকদের বিষয়ে তেহরান ‘নতুন কোনো প্রতিশ্রুতি’ দেয়নি।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, জাতিসংঘ পরিদর্শকদের সঙ্গে যেকোনো ধরনের যোগাযোগ ‘সংসদ এবং সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল কর্তৃক নির্ধারিত বিদ্যমান প্রক্রিয়া অনুযায়ী’ সম্পন্ন হবে।
আইএইএ তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
গত গ্রীষ্মে ১২ দিনের যুদ্ধের সময় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলার শিকার হওয়া পরমাণু কেন্দ্রগুলোতে আইএইএ-এর প্রবেশাধিকার স্থগিত করেছিল ইরান।
এর পরের মাসে, জাতিসংঘের এই পরমাণু পর্যবেক্ষণ সংস্থাটি জানায়, তারা ইরান থেকে তাদের অবশিষ্ট পরিদর্শকদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে।
২০১৫ সালে ইরান এবং বিশ্বের ছয়টি পরাশক্তি- যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ফ্রান্স, রাশিয়া, জার্মানি এবং যুক্তরাজ্য- একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল, যা ইরানে আইএইএ-কে পরমাণু কেন্দ্রগুলো পরিদর্শনের অনুমতি দিয়েছিল।
২০১৮ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে, তিনি এটিকে একটি ‘খারাপ চুক্তি’ বলে আখ্যা দিয়ে এই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন।
ভ্যান্স সোমবার জানান, ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে ‘যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে আবারো খুব শক্ত আঘাত করতে পারে’ বলে সতর্ক করার পর, রবিবার ইরানি প্রতিনিধিরা আলোচনা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন।
মার্কিন ভাইস-প্রেসিডেন্ট বলেন, তিনি ইরানি আলোচনাকারীদের বুঝিয়েছেন যে ট্রাম্প কেবল ইরানের ‘বাজে কথার’ জবাব দিচ্ছিলেন।
সোমবার ওভাল অফিস থেকে ট্রাম্প ইরানকে নতুন করে হুশিয়ারি দেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, “ইরান যদি তাদের চুক্তি মেনে না চলে বা ঠিকঠাক আচরণ না করে, তাহলে আমাকে যা করতে হবে আমি তাই করব।”
ইরানি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার ইরানের প্রধান আলোচনাকারীরা বৈঠক ছেড়ে চলে যান, তবে পক্ষগুলোর মধ্যে প্রযুক্তিগত আলোচনা অব্যাহত থাকার কথা রয়েছে।
কাতারি ও পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচলের উদ্দেশ্যে এবং যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনা ও ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে একটি ‘যোগাযোগ লাইন’ তৈরি করা হয়েছে।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, লেবাননে সামরিক অভিযান বন্ধের লক্ষ্যে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর সহযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং লেবাননের মধ্যে একটি ‘সংঘাত এড়ানো সেল’ গঠনে উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাকচি বলেছেন, প্রথম ‘আসল পরীক্ষা’ হবে লেবাননে।
শনিবার রাত থেকে ইসরায়েল এবং লেবাননের হিজবুল্লাহর মধ্যে লড়াই কমে এসেছে এবং একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি বজায় রয়েছে।