প্রতিপক্ষ পাকিস্তান মানেই জয়ের বাড়তি ক্ষুধা। সেটা খেলার মাঠে হোক কিংবা যুদ্ধের ময়দান। স্বাধীনতার মাসে পাকিস্তানকে হারানোটা বাড়তি পাওয়া, সেটা যদি হয় বিশ্বকাপের মঞ্চে বাংলার মেয়েদের প্রথম জয়, সেটা তো অনেক বড় কিছু।

১৯৯৯ সালে ছেলেদের বিশ্বকাপে প্রথমবার অংশ নিয়ে পাকিস্তানকে হারানোর সেই স্মৃতি এখনও উজ্জ্বল। সেই ঐতিহাসিক ম্যাচটার প্রেরণা ততদিন থেকে যাবে, যতদিন ক্রিকেটে থাকবে বাংলাদেশ।

ছেলেদের সেই ইতিহাসের সঙ্গে এবার যোগ হলো মেয়েরা। ২০২২ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে গিয়ে হারিয়ে দিয়েছে পাকিস্তানকে। হ্যামিলটনের স্যাডন পার্কে পিছিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত ৯ রানের ঐতিহাসিক জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে নিগার, জাহানারা, ফাহিমারা।

আসরে প্রথম দুই ম্যাচে অনুজ্জ্বল অধিনায়ক নিগার সুলতানা ঠিকই জ্বলে ওঠেন পাকিস্তানের বিপক্ষে। ফিফটি থেকে ৪ রান দূরে থাকতে সাজঘরে ফিরলেও খেলেন ৬৪ বলে ৪৬ রানের ইনিংস।

জয়ের পর নিগার বলেছেন, ‘বিশ্বকাপে প্রথম জয়ের আনন্দ আসলে অন্যরকম। এখনও পর্যন্ত আমি মনে করি আলহামদুলিল্লাহ, এই জয়টা আমাদের অনেক প্রয়োজন ছিল। এই টুর্নামেন্টে একটা মোমেন্টাম দরকার ছিল, যেটা আমরা আজকে পেয়েছি।’

নিগারের নেতৃত্বে দুর্দান্ত খেলছে বাংলাদেশ। প্রথম দুই ম্যাচে হেরে গেলেও নিগারের মাঠের বাইরের নেতৃত্বও দলকে সাহস হারাতে দেয়নি। তারই সুফল পেল দল।নিজের নেতৃত্ব নিয়ে নিগার বলেছেন, ‘আমার নিজের জন্য… বিশ্বকাপে দল প্রথম জয় পেয়েছে এবং আমি এই দলের নেতৃত্ব দিয়েছি, এ জন্য আমি অনেক গর্ববোধ করি। আশা করব ভবিষ্যতেও যেন আমরা এ রকম জয়ের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারি।’

দলের হয়ে সবচেয়ে বেশি ৭১ (১১৫) রানের ইনিংস খেলা ফারজানা হক বলেছেন, ‘অবশ্যই জয় সব সময় আনন্দদায়ক ও খুশির একটা বিষয়। আমাদের সবার জন্য জয়টা দরকার ছিল। আমরা বিশ্বাস করেছিলাম যে, সবাই মিলে যদি একসঙ্গে খেলতে পারি, জয়টা আমাদের জন্য সম্ভব হবে। কাজটা করতে পেরেছি বলেই জয়টা এসেছে।’

পাকিস্তানকে হারিয়ে পরের ম্যাচগুলোতেও দারুণ কিছুর প্রত্যাশা করা ফারজানা আরও বলেছেন, ‘পরের চার ম্যাচের জন্য এই জয় অবশ্যই আমাদের অনেক অনুপ্রাণিত করবে। আমরা সবাই যদি একে অপরের সঙ্গে মিলে জুটি গড়ে যার যার কাজ সুন্দরভাবে করতে পারি, অবশ্যই সামনেও ভালো হবে আমাদের।’

দলের অন্যতম লেগ স্পিন-অলরাউন্ডার রুমানা আহমেদ পাকিস্তানের বিপক্ষে বিপদের মুহূর্তে জ্বলে উঠেছেন ঠিকই। ব্যাট হাতে ১৬ রানের পর ২টি উইকেটও নেন ২৯ রান দিয়ে।

ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রুমানা স্মরণ করেছেন ১৯৯৯ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে বড় ভাইদের ঐতিহাসিক জয়টাও, ‘আমরা খুবই আনন্দিত। এই প্রথম আমরা বিশ্বকাপে এসেছি এবং তৃতীয় ম্যাচটি পাকিস্তানের সঙ্গে খুব ভালোভাবে জিততে পেরেছি। আমার কাছে যেটা মনে হয়েছে যে আমরা আমাদের ভাইদের মতো ইতিহাস রচনা করেছি। তারা যেমন তাদের প্রথম বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে হারিয়েছিল, আমরাও প্রথম বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে জয়লাভ করেছি।’

রুমানা মনে করেন, এই জয় দেশের নারী ক্রিকেটের জন্য অনেক বড় মাইলফলক, ‘এটা আমাদের জন্য, আমাদের ক্রিকেটের জন্য বড় একটা মাইলফলক হবে বলে আমি মনে করি। এই জয় নিয়ে সামনের ম্যাচগুলোর জন্য আরও আত্মবিশ্বাস গড়ে উঠবে আমাদের। মেয়েরা আরও ভালো ক্রিকেট উপহার দেবে।’

দলের জয়ে অন্যতম পারফর্মার ফাহিমা খাতুন। ম্যাচ থেকে ছিটকে যাবার সময়ে গুরুত্ব পূর্ণ উইকেট নিয়ে ম্যাচে ফেরান দলকে। ফাহিমা ৩৮ রান খরচায় ৩ উইকেট নিয়ে হয়েছেন ম্যাচ সেরা।

উচ্ছ্বসিত ফাহিমা বলেছেন, ‘খুবই ভালো লাগছে। সব সময় আমি একটা কথা বলে আসছি এবং দলের সবাই বলে আসছে যে, পাকিস্তানের বিপক্ষে আমরা সবসময় জেতার জন্যই খেলি। জেতার ক্ষুধাটা থাকে আমাদের। সেটাই আমরা আজকে চেষ্টা করেছি, পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোনোর এবং যথাযথ কাজে লাগাতে পেরেছি শেষ পর্যন্ত।’

পরাজয়ের অনেকটা দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েও ম্যাচ বের করে আনা ফাহিমা আরও বলেছেন, ‘একটা সময় হয়তো বাইরে থেকে অনেকেই অনেক কিছু মনে করছিল যে ম্যাচ আমাদের কাছ থেকে সরে যাচ্ছে। তবে আমার ও দলের বিশ্বাস ছিল… ওদের উইকেট না পড়লেও রান আমরা আটকে রাখতে পেরেছিলাম। সেটাই শেষ পর্যন্ত আমাদের কৃতিত্ব যে ওরা রানের চাপ নিয়ে মারতে গিয়ে আমাদের উইকেট দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত জয়টা আমাদের দিকে এসেছে।’

দলের অন্যতম তারকা পেসার জাহানারা আলম মনে করেন, এই ঐতিহাসিক জয়ের অনুপ্রেরণা নিয়ে পরবর্তী প্রজন্মের ক্রিকেট এগিয়ে যাবে অনেক দূর।

‘আজকের জয়ে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত এবং আমরা মনে করি, আমরা ইতিহাস গড়েছি। আমার বিশ্বাস, এতে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম কয়েক ধাপ এগিয়ে যাবে। আমি মনে করি, মেয়েদের ক্রিকেটের জন্য এটি একটি মাইলফলক। যেটা ১৯৯৯ সালে আইসিসি ট্রফিতে (বিশ্বকাপে) ছেলেদের দল করেছিল, ঠিক একই কাজ আমরা করেছি আমাদের প্রথম বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে হারিয়ে। এটা আসলেই একটা ইতিহাস ও মেয়েদের ক্রিকেটের জন্য বড় পাওয়া।’