মোস্তফা কামাল তোহা, প্রিয় আলোঃ রাজধানীর রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনায় এসেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদল-এর ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখার সম্ভাব্য নতুন নেতৃত্ব। দীর্ঘদিন ধরে পূর্ণাঙ্গ কমিটি না থাকায় সংগঠনটির ভেতরে যেমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তেমনি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও মাঠপর্যায়ে সক্রিয়, ত্যাগী ও সাংগঠনিকভাবে দক্ষ নেতাদের মূল্যায়নের দিকে নজর দিচ্ছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
আর এই আলোচনায় সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে দুই নাম—সভাপতি পদে ফয়সাল আহমেদ সজল এবং সাধারণ সম্পাদক পদে শেখ খালিদ হাসান জ্যাকি। দলীয় নেতাকর্মীদের মতে, ছাত্ররাজনীতি থেকে শুরু করে বিএনপির বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা রাখার কারণে তৃণমূল পর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে এই দুই নেতার। বিশেষ করে সরকারবিরোধী আন্দোলন, অবরোধ, মিছিল ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ধারাবাহিক উপস্থিতি তাদেরকে “ক্লিন ইমেজের সংগঠক” হিসেবে পরিচিতি এনে দিয়েছে।
ফয়সাল আহমেদ সজল মূলত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল-এর রাজনীতি থেকে উঠে আসা একজন পরীক্ষিত সংগঠক। ছাত্রজীবনের শুরু থেকেই তিনি সংগঠনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। অর্থনীতি বিভাগের (হল মর্যাদা) আহ্বায়ক হিসেবে রাজনৈতিক যাত্রা শুরু করে পরবর্তীতে টিপু–সাত্তার কমিটিতে সদস্য, সাত্তার–পারভেজ কমিটিতে সহ-সম্পাদক, পারভেজ–খোকন কমিটিতে সহ-সাধারণ সম্পাদক এবং শাহীন–খলিল কমিটিতে যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতির দায়িত্ব পালনকালে ক্যাম্পাসে অবস্থান করায় তিনি একাধিকবার ছাত্রলীগের হামলার শিকার হন বলে নেতাকর্মীরা জানান। তবুও তিনি দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে ক্যাম্পাস ছাড়েননি। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন থানায় তার বিরুদ্ধে ৩২টি মামলা হয়। এ পর্যন্ত তিনি চারবার কারাবরণ করেছেন এবং ১৬ মাসের বেশি সময় কারাগারে ছিলেন। এছাড়া ১৬ দিন রিমান্ডে নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে দুটি মামলায় তাকে দুই বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
সাংগঠনিক দক্ষতা, কর্মীদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতির দায়িত্ব লাভ করেন। পরে কেন্দ্রীয় ছাত্ররাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে উঠে আসেন সজল। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সম্পাদক ও সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
অন্যদিকে শেখ খালিদ হাসান জ্যাকি দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার ছাত্ররাজনীতিতে পরিচিত একটি নাম। তিনি ঢাকা মহানগর পূর্ব ছাত্রদল-এর সাবেক আহ্বায়ক এবং ধানমন্ডি থানা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে তিনি পরিচিত একজন রাজপথকেন্দ্রিক সংগঠক হিসেবে, যিনি আন্দোলনের কঠিন সময়েও মাঠ ছাড়েননি।
বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা জানান, সরকারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার কারণে জ্যাকিকে একাধিকবার গ্রেপ্তার ও মামলার মুখোমুখি হতে হয়েছে। ঢাকা মহানগরের আটটি থানায় তার বিরুদ্ধে ৮৬টি মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে। এ পর্যন্ত পাঁচবার কারাবরণ করেছেন তিনি এবং আট মাসের বেশি সময় কারাগারে ছিলেন। এছাড়া ২৭ দিন রিমান্ডে নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
২০২১ সালে তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে ছাত্রদল বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের ২ জুলাই রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হলে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। ছাত্রদলের অভিযোগ ছিল, সরকারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার কারণেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
শুধু সাংগঠনিক দায়িত্বেই নয়, মাঠের আন্দোলনেও জ্যাকির সরব উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। অবরোধ, মশাল মিছিল ও বিক্ষোভ কর্মসূচিতে তাকে নিয়মিত নেতৃত্ব দিতে দেখা গেছে। ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে দেশব্যাপী অবরোধ কর্মসূচির সমর্থনে খিলগাঁও এলাকায় তার নেতৃত্বে মশাল মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে ছাত্ররাজনীতি করে উঠে আসা এবং ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকা নেতাদের প্রতি বিএনপির হাইকমান্ডের আলাদা আস্থা রয়েছে। বিশেষ করে আগামী দিনের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী ও মাঠকেন্দ্রিক নেতৃত্বকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সেই বাস্তবতায় ফয়সাল আহমেদ সজল ও শেখ খালিদ হাসান জ্যাকিকে ঘিরে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। নেতাকর্মীদের অনেকে মনে করছেন, সজল-জ্যাকি নেতৃত্বে নতুন কমিটি গঠিত হলে থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিট পর্যায়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে এবং দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা কমিটিগুলো পূর্ণাঙ্গ করার সুযোগ তৈরি হবে।
মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের ভাষায়, “ত্যাগী ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতৃত্বই এখন সময়ের দাবি।” আর সেই বিবেচনায় ছাত্ররাজনীতি থেকে উঠে আসা এই দুই নেতাকে ঘিরেই দক্ষিণ যুবদলের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ঈদের আগেই নতুন কমিটি ঘোষণা হতে পারে বলেও জোর গুঞ্জন রয়েছে।