বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা ও উদ্ভাবনে মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

সোমবার (১৮ মে) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে ‘ট্রান্সফর্মিং হাইয়ার এডুকেশন ইন বাংলাদেশ: রোডম্যাপ টু সাসটেইনেবল এক্সিলেন্সি’ শীর্ষক কর্মশালার উদ্বোধনীতে তিনি এ কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক র‌্যাংকিংয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান এখনও প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। গবেষণা, প্রকাশনা, সাইটেশন ও উদ্ভাবনকে র‌্যাংকিংয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। শুধু পুঁথিগত শিক্ষা নয়, গবেষণা-উদ্ভাবন ছাড়া প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকা কঠিন।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এআই, রোবটিক্স, আইওটি, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, বায়োটেকনোলজি, সাইবার সিকিউরিটি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, বিগ ডাটা, ন্যানো টেকনোলজি, ফাইভজির মতো প্রযুক্তি চিন্তা ও কর্মক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণ করছে। এসব প্রযুক্তি প্রথাগত চাকরির বাজার কমালেও নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করছে।

তিনি বলেন, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মুখস্থ ও সার্টিফিকেট নির্ভর শিক্ষা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষা ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে। শিক্ষা এখন রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উদ্ভাবন ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার প্রধান নিয়ামক। তাই বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের সংযোগ বাড়াতে হবে, কারিকুলামে শিল্পের চাহিদা যুক্ত করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে জ্ঞানের চর্চা এক বিষয়ে সীমাবদ্ধ নয়। ডাটা সায়েন্সের সঙ্গে বায়োলজি বা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সঙ্গে সমাজবিজ্ঞানের মেলবন্ধন হচ্ছে। এ পরিবর্তনের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক রাখা জরুরি।

তিনি আরও বলেন, প্রতি বছর লাখো শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হলেও অনেকে বেকার থাকেন। দক্ষতার অভাবে শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্ব বেশি। তাই প্রাথমিক থেকে উচ্চতর পর্যায় পর্যন্ত কারিকুলাম ঢেলে সাজানো সময়ের দাবি। নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন কর্মমুখী শিক্ষা ছাড়া বেকারত্ব কমবে না।

সরকার এপ্রেন্টিসশিপ, ইন্টার্নশিপ ও ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সহযোগিতা বাড়াচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, বিভাগীয় শহরের বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক গড়ে তোলা হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীরা পুঁথিগত শিক্ষার পাশাপাশি হাতে-কলমে দক্ষতা পাবে।

ইনোভেটিভ বিজনেস আইডিয়া বাণিজ্যিকীকরণে সিড ফান্ডিং ও ইনোভেশন গ্রান্ট দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ক্যাম্পাস থেকে উদ্যোক্তা তৈরি, উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, সায়েন্স পার্ক প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে। দেশি-বিদেশি অংশীদারত্বে বিজ্ঞান মেলা, ইনোভেশন ফেয়ার, প্রোডাক্ট সোর্সিং ফেয়ারের আয়োজন উৎসাহিত করা হবে। স্কুল পর্যায় থেকেই কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

ব্রিটিশ লেখক টম উইনের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উবারের নিজের ট্যাক্সি নেই, ফেসবুক কনটেন্ট তৈরি করে না, আলিবাবার মজুদ পণ্য নেই, এয়ারবিএনবির রিয়েল এস্টেট নেই। ইনোভেটিভ আইডিয়া দিয়েই তারা বিশ্বে নেতৃত্ব দিচ্ছে।

তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা এগিয়ে নিতে সরকার বরাদ্দ দেবে। তবে অনেক দেশে এলামনাইরাও গবেষণায় পৃষ্ঠপোষকতা করেন। শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ, এলামনাইরা মেরুদণ্ড। দেশ-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত এলামনাইদের শিক্ষা ও গবেষণায় যুক্ত করতে শিক্ষাবিদদের আহ্বান জানান তিনি।

মেধা পাচার রোধ করে মেধার বিকাশ ও লালনের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সীমিত সম্পদের কার্যকর ব্যবহারে নতুন কিছু করা সম্ভব। ফ্যাসিবাদ-স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে তারুণ্যের আন্দোলনে দেড় দশক পর গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ সরকার জ্ঞান ও মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র গড়তে চায়।

তিনি বলেন, আমরা এমন শিক্ষা ব্যবস্থা চাই যেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থী সম্ভাবনা বিকশিত করতে পারবে। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষকে আলিঙ্গন করব, তবে ধর্মীয়, সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধ যেন হারিয়ে না যায়। এ বিষয়ে সকলকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ প্রধানমন্ত্রীকে ক্রেস্ট উপহার দেন। সভাপতিত্ব করেন ড. মামুন আহমেদ। বক্তব্য রাখেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন, শিক্ষা সচিব আবদুল খালেক ও ইউজিসির সচিব ফখরুল ইসলাম।