মোস্তফা কামাল তোহা, ঢাকা | রাজধানীর রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লার চায়ের কাপে এখন একটাই আলোচনা, আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নতুন শক্তির উত্থান নাকি পুরনো মিত্রদের নতুন কৌশল? বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী এবং নবগঠিত এনসিপি (জাতীয় নাগরিক পার্টি)-র সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড ও বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, সামনে তারা হয়তো এককভাবে লড়ার ঘোষণা দিচ্ছে, কিন্তু পর্দার আড়ালে চলছে এক গভীর রাজনৈতিক দাবার চাল।
সম্প্রতি এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এবং নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সারজিস আলমের বক্তব্যে এক ধরনের ‘দ্বৈত অবস্থান’ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একদিকে তারা ঢাকার দুই সিটিতে আসিফ মাহমুদ ও আরিফুল ইসলাম আদিবের নাম ঘোষণা করে একক শক্তিমত্তার জানান দিচ্ছেন, অন্যদিকে বলছেন ‘জোটের বৃহত্তর স্বার্থে সমঝোতা হলেও হতে পারে’। রাজনীতির ভাষায় একে বলা হয় ‘বারগেইনিং চিপ’। অর্থাৎ, নিজেদের পাল্লা ভারি দেখিয়ে মিত্রদের কাছ থেকে বড় ভাগ আদায় করে নেওয়া।
জামায়াত এবং এনসিপি উভয় দলই জানে যে, ঢাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিটিতে তারা যদি একে অপরের মুখোমুখি হয়, তবে লাভ হবে তৃতীয় কোনো পক্ষের। তাই এখনকার এই ‘একক প্রস্তুতির’ মহড়া মূলত শেষ সময়ে একটি লাভজনক সমঝোতায় পৌঁছানোর কৌশল মাত্র।
আখতার হোসেনের বক্তব্যে ‘১১ দলের মতো জোটগতভাবে অংশ নেওয়ার পরিস্থিতি’র উল্লেখ বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। এতে ধরে নেওয়া যেতে পারে, এনসিপি কেবল একা নয়, বরং একটি বৃহত্তর প্ল্যাটফর্মকে সামনে রেখে জামায়াতের সাথে আসন ভাগাভাগির টেবিলে বসতে চায়। সারজিস আলমের সুরও একই দিকে “কিছু জায়গায় দল কঠোর অবস্থানে থাকবে, আবার কিছু জায়গায় ছাড় দিতে হতে পারে।” এই ‘ছাড়’ শব্দটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে পর্দার আড়ালের সমঝোতার ইঙ্গিত।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীর ব্যক্তিগত ইমেজের পাশাপাশি দলীয় ভোটব্যাংক বড় ফ্যাক্টর। জামায়াতের একটি সুসংগঠিত সুবিন্যস্ত কেন্দ্র থেকে মাঠ পর্যায় পর্যন্ত কমিটির স্তর বা ক্যাডার ও ভোটব্যাংক রয়েছে, যা এনসিপির তরুণ ও নতুন ভোটারদের সাথে যুক্ত হলে নির্বাচনি বৈতরণী পার হওয়া সহজ হবে।
২০২৬-এর এই স্থানীয় নির্বাচন মূলত পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের একটি লিটমাস টেস্ট। এখানে একে অপরকে চ্যালেঞ্জ না ছুড়ে বরং একটি ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং’-এ আসা উভয় দলের জন্যই নিরাপদ।
এনসিপি যে দ্রুততার সাথে ১০০ প্রার্থীর তালিকা এবং সার্চ কমিটি গঠন করেছে (তথ্যসূত্র: ১১ মে ২০২৬-এর দলীয় ঘোষণা), তা জামায়াতের ওপর একটি মানসিক চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবেও দেখা যেতে পারে। তারা বোঝাতে চাইছে, সমঝোতা না হলেও তারা মাঠ ছাড়বে না।
আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার মতো প্রার্থীদের দক্ষিণে দাঁড় করিয়ে এনসিপি মূলত নিজেদের সর্বোচ্চ শক্তি প্রদর্শন করছে। তবে ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বাংলাদেশের রাজনীতিতে আদর্শের চেয়ে ‘নির্বাচনি কৌশল’ সবসময়ই প্রাধান্য পেয়েছে। জামায়াতও নীরব থেকে তাদের চাল চালছে। তারা সম্ভবত এনসিপি-কে তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে সামনে রেখে পর্দার আড়াল থেকে সমর্থন দেওয়ার নীতি গ্রহণ করতে পারে, যাতে সরকারের বা আন্তর্জাতিক মহলের সরাসরি রোষানলে না পড়তে হয়।
আদতে জামায়াত-এনসিপি কি একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নাকি ‘কৌশলী মিত্র’? এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিনে। তবে এটুকু নিশ্চিত যে, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কেউই একা ঝুঁকি নিতে চাইবে না। “
লেখকঃ মোস্তফা কামাল তোহা, জেষ্ঠ্য বার্তাকক্ষ সম্পাদক, নাগরিক টিভি
ইমেইল : md.mostafakamaltoha@gmail.com