মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিক পাঠানোর কার্যক্রম খুব শিগগিরই আবারও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন।
রোববার (১২ এপ্রিল) দুপুরে সচিবালয়ে মালয়েশিয়া সফর নিয়ে ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা বলেন। এ সয়ম প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সফরের জন্য মালয়েশিয়া সরকার আমন্ত্রণ জানিয়েছে বলেও জানান মাহদী আমিন।
উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, প্রবাসীদের জীবনমান উন্নয়নে বর্তমান সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কম খরচে এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কর্মী পাঠানো নিশ্চিত করতে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের সিন্ডিকেট যেন না থাকে, সে জন্য মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
তিনি জানান, বিষয়টিতে দুই দেশের সরকারই ইতিবাচক। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যেমন আগ্রহী, তেমনি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীও এ বিষয়ে সহযোগিতামূলক মনোভাব দেখিয়েছেন।
গত বুধবার মালয়েশিয়ায় সফরে যান শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার উপদেষ্টাদের মধ্যে মাহদী আমিন শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মূখপাত্র তিনি। বাংলাদেশে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর শ্রমবাজার নিয়ে আলোচনা করতে এটি ছিল প্রথম সফর।
এই সফরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের কার্যালয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তিনি।
এছাড়া মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রী দাতো শ্রী রমন রামকৃষ্ণনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন। সফরের সময় মালয়েশিয়ার উচ্চশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দেশটির উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী জাম্ব্রি আবদুল কাদিরের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, শ্রম ও কর্মসংস্থান বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন একটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠকও করেন।
মালয়েশিয়া সফর শেষে শনিবার (১১ এপ্রিল) দেশে ফেরেন মন্ত্রী ও উপদেষ্টা। শ্রমিক পাঠানো কবে শুরু হবে—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি এখনও প্রক্রিয়াধীন। আমরা যত দ্রুত সম্ভব এটি উন্মোচনের জন্য কাজ করে যাচ্ছি।
মামলা সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা বলেন, যৌথ বিবৃতিতে এ বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে এখন যে গণতান্ত্রিক সরকার রয়েছে, আমরা আইনের শাসনে বিশ্বাস করি। বিচার বিভাগ তার নিজস্ব গতিতে চলবে। যারা অপরাধী, যারা দুর্নীতি বা অপকর্মে যুক্ত, তারা আইনি প্রক্রিয়ায় শাস্তি পাবে। একইভাবে যারা নির্দোষ, তারাও সুবিচার পাবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
‘ক্রেডিবল রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি’ প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে মাহদী আমিন বলেন, এটি কোনো নতুন সিন্ডিকেট তৈরির উদ্যোগ নয়। এটি শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, মালয়েশিয়ার সব সেন্ডিং কান্ট্রির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তাদের নির্দিষ্ট কিছু মানদণ্ড রয়েছে, সেই অনুযায়ী তারা এজেন্সি নির্বাচন করে।
বাংলাদেশের অবস্থান ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, আমরা ক্রেডিবল বা কোয়ালিফাইড বলতে তাদেরই বোঝাবো, যারা দুর্নীতিমুক্ত থেকে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় রিক্রুটমেন্ট পরিচালনা করবে। এর মাধ্যমে আমরা ধীরে ধীরে অভিবাসন ব্যয় কমিয়ে আনতে চাই। মালয়েশিয়ার উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশের শ্রমিকদের অসাধারণ ভূমিকা রয়েছে। সুতরাং আমরা অনুরোধ জানিয়েছি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যেন বিশেষভাবে ওনারা বিবেচনা করেন। এবং সেই প্রতিশ্রুতি ওনারা দিয়েছেন যে সামগ্রিকভাবে আলাপ -আলোচনার মাধ্যমে আমাদেরকে পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানাবেন যে বাংলাদেশের শ্রমিকদের জন্য আলাদাভাবে আলাদা নিয়মে কোনো কিছু করার সুযোগ থাকবে কি না।
‘আমরা মালয়েশিয়ার উচ্চ শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছি। সেখানে বাংলাদেশের সাথে মালয়েশিয়ার উচ্চশিক্ষায় কীভাবে ডিগ্রি এবং সার্টিফিকেটের ক্ষেত্রে সমন্বয় করার সুযোগ থাকে, পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ থাকে, বিশেষভাবে টিচার এবং স্টুডেন্ট এক্সচেঞ্জের ক্ষেত্রে আমাদের নতুন দ্বার উন্মুক্ত করা যায় কি না -তা নিয়ে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীও যথেষ্ট আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, সেই বার্তা আমরা পৌঁছে দিয়েছি।’
মাহদী আমিন বলেন, আমাদের মূল উদ্দেশ্য মালয়েশিয়ার উচ্চ শিক্ষামন্ত্রীর সাথে আলোচনায় যেটি উঠে এসেছে দুটো দেশের শিক্ষা ক্ষেত্রে বহুমুখী সহযোগিতা এবং গবেষণার জন্য কীভাবে একটি প্লাটফর্ম তৈরি করা যায় এবং দুই দেশের শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের একসাথে কাজ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে আমরা আরও বেশি কোলাবোরেশন তৈরি করতে পারি।
‘আমরা আমাদের তিনদিনের এই স্বল্প সফরে মালয়েশিয়ার সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত বেশ কিছু দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে অংশগ্রহণ করেছি। একটি বার্তা খুব সুষ্পষ্ট। আমরা জনগণের ক্ষমতায়নের দল হিসেবে একটি অবাধ সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনায় এসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের যে প্রধান লক্ষ্য স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় অভিবাসন ব্যয় কমিয়ে কত দ্রুত কত বেশি সংখ্যক মানুষ বিদেশে কাজ করতে পারবেন, জনশক্তি রপ্তানি করতে পারব সেটিই ছিল আমাদের মূল প্রাধান্য। এবং মালয়েশিয়া সরকারও বলেছেন আমরা যেভাবে ওনাদের সাথে এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছি এবং যেভাবে গুরুত্ব আরোপ করেছি ব্যয় কমানোর জন্য এর আগে তেমন কোনো সরকার এতটা চাপ প্রদান করেনি।’
মাহদী আমিন বলেন, জনশক্তি রপ্তানি শুরু হয়েছিল বাংলাদেশ থেকে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময়। এবং আজকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার অন্যতম বড় ভিত্তি আমাদের বিদেশে থাকা কষ্ট করা লাখো লাখো কোটি মানুষের যে শ্রম ঘাম সেটি। সুতরাং বিএনপি সবসময় জনশক্তি রপ্তানিকে আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার একটি প্রধান বাহন মনে করে। এটি আমাদের জন্য গৌরবের একটা বিষয়। প্রবাসী কল্যাণে যে মন্ত্রণালয় সেটিও শুরু হয়েছিল দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময়। যার কারণে প্রবাসীদের কল্যাণ আমাদের জন্য একটি বড় অগ্রাধিকার।
তিনি বলেন, এই বছর প্রথমবারের মতন আমাদের প্রবাসী ভাই -বোনেরা ভোট দিয়েছেন, যা আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল এবং তার আলোকে আমরা সামনে ইনশাআল্লাহ প্রবাসী কার্ড শুরু করব। আমাদের প্রবাসী প্রতিটি ভাই এবং বোনদের পাশে আমরা থাকব। আমাদের নেতা গণমানুষের নেতা তারেক রহমানের যে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রয়েছে তার আলোকে আমাদের সর্বাঙ্গীন প্রচেষ্টা থাকবে যত দ্রুত সম্ভব বহির্বিশ্বের আমাদের জনশক্তি রপ্তানি আরও কীভাবে আমরা বৃদ্ধি করতে পারি আনস্কিল্ড, স্কিল্ড, সেমি স্কিল্ড প্রত্যেকটা ক্যাটাগরিতে। এবং পৃথিবীর যেই দেশে আমাদের প্রবাসী ভাই এবং বোনেরা রয়েছেন কীভাবে তাদের জীবনমান আরও উন্নত করতে পারি, কীভাবে ওনারা আরও একটু স্বাচ্ছন্দ্যে আরও নিরাপদে থাকতে পারেন সেটির জন্য আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তিনি আরও বলেন, মালয়েশিয়া সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় গিয়েছিলাম। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী যেভাবে বরণ করে নিয়েছেন, তিনি যেভাবে আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে শুভকামনা জানিয়েছেন, মালয়েশিয়ায় যাওয়ার জন্য নিমন্ত্রণ জানিয়েছেন এবং আমাদেরকে আন্তরিকতার সঙ্গে বলেছেন, সব সমস্যা ইনশাআল্লাহ আমরা একসাথে কাজ করে সামনে সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করব, সেটি একটি অভূতপূর্ব উদ্যোগ।