লেবাননভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ-এর অবিরাম রকেট হামলার মুখে উত্তর ইসরায়েল-এর সীমান্তবর্তী জনপদগুলো কার্যত জনশূন্য ও ভীতিকর পরিবেশে পরিণত হয়েছে।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই নিজের শহরের মানুষদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারার যন্ত্রণায় জনসমক্ষে কান্নায় ভেঙে পড়েন কিরিয়াত শমোনা শহরের মেয়র আভিচাই স্টার্ন।
বুধবার (২৫ মার্চ) সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক ভার্চুয়াল বৈঠকে তিনি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু-এর নেতৃত্বাধীন সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন।
স্টার্ন এই পরিস্থিতিকে একটি “বড় পরাজয়” হিসেবে উল্লেখ করেন এবং সরকারের ব্যর্থতার দায় তুলে ধরেন।
টাইমস অব ইসরায়েল-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হিজবুল্লাহর লাগাতার রকেট হামলায় উত্তর ইসরায়েলের জনজীবন মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে স্বাভাবিক জীবনযাপন প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।
মেয়র স্টার্ন জানান, প্রায় ২৪ হাজার জনসংখ্যার এই শহরে এখন মাত্র ১০ হাজার মানুষ অবশিষ্ট আছে। তার আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতি চলতে থাকলে এক মাসের মধ্যেই শহরটি পুরোপুরি জনশূন্য হয়ে যেতে পারে।
তিনি অভিযোগ করেন, নাগরিকদের সুরক্ষার বিষয়ে সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কোনো কাজে আসছে না।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু স্থানীয় প্রশাসনকে অনুরোধ করেন, যেন তারা বাসিন্দাদের এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়া থেকে বিরত রাখেন। তবে এই আহ্বানকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মেয়র ও কাউন্সিল প্রধানদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
স্টার্ন পাল্টা প্রশ্ন তুলে বলেন, রকেট হামলার সময় সাইরেন বাজার পর নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছানোর জন্য মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময় পাওয়া যায়।
এমন পরিস্থিতিতে পর্যাপ্ত বোম শেল্টার না থাকলে সাধারণ মানুষ কীভাবে নিজেদের নিরাপদ রাখবে—এ প্রশ্ন তুলে তিনি সরকারের প্রতি কঠোর সমালোচনা করেন।
তিনি আরও দাবি করেন, শহরের প্রায় ৪ হাজার ৭০০টি অরক্ষিত ঘরবাড়ি থেকে বিশেষ করে অসহায়, বৃদ্ধ ও শারীরিকভাবে অক্ষম মানুষদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি আরও বাড়বে বলে তিনি সতর্ক করেন।
উত্তরাঞ্চলীয় মাত্তে আশের আঞ্চলিক কাউন্সিলের প্রধান মোশে দাভিদোভিচ-ও সরকারের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতির সমালোচনা করেন।
তিনি ২০১৮ সালে ঘোষিত “নর্দান শিল্ড” প্রকল্পের কথা উল্লেখ করে বলেন, ২০২৬ সালেও হাজার হাজার মানুষ এখনো পর্যাপ্ত সুরক্ষা ছাড়াই হিজবুল্লাহর হামলার মুখে বসবাস করছে।
তার মতে, সুরক্ষা খাতে বাজেট কমিয়ে দেওয়ায় হাজারো ভবন এখন চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
অন্যদিকে, মার্গালিওট মোশ্যাভের মেয়র ইতান দাভিদি আবেগাপ্লুত হয়ে এক তরুণের মৃত্যুর ঘটনাকে তুলে ধরেন। তিনি জানান, ২৭ বছর বয়সী নুরিএল দুবিন সম্প্রতি রকেট হামলায় নিহত হয়েছেন, যিনি আগামী সেপ্টেম্বরেই বিয়ে করার পরিকল্পনা করেছিলেন।
কিন্তু সেই আনন্দঘন ভবিষ্যতের বদলে এখন তাকে দাফন করা হয়েছে।
দাভিদি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ইসরায়েল যেন তাদের নাগরিকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা লেবাননের হাতে ছেড়ে দিয়েছে,” এবং রাষ্ট্র তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন।
এদিকে, বৃহস্পতিবারও হিজবুল্লাহর ছোড়া ক্লাস্টার বোমার আঘাতে একজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী পাল্টা হামলার দাবি করলেও সীমান্ত এলাকার মানুষজন বলছেন, তারা প্রতিনিয়ত মৃত্যুর ভয়ে দিন কাটাচ্ছেন।
সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ এবং অস্থির রয়ে গেছে। তথ্যসূত্র : টাইমস অব ইসরায়েল