মোস্তফা কামাল তোহা, বরিশাল: বর্ষা এলেই দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের মনে বাড়ে উৎকণ্ঠা। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের পাশাপাশি নদীভাঙনের কবলে পড়ে প্রতিবছর গৃহহীন হয়ে পড়ছে অসংখ্য পরিবার। এমনই এক উন্নয়নবঞ্চিত ও অবহেলিত জনপদ বরিশালের হিজলা উপজেলার ১ নম্বর হরিনাথপুর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ড।

স্থানীয়দের অভিযোগ, স্বাধীনতার পর থেকে এলাকাটিতে কোনো জেলা প্রশাসকের সরাসরি উপস্থিতি নেই। রাজনৈতিক নেতাদের আগমন ছাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারও শেষ কবে এখানে পদচারণা হয়েছে, তা জানেন না এলাকাবাসী।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এর কাজ নদী শাসন, নদী রক্ষা বাঁধ নির্মাণ, ভাঙন প্রতিরোধ প্রকল্প বাস্তবায়ন ও তীর সংরক্ষণ। অথচ, প্রতিষ্ঠানটি এই অঞ্চলে এখনো কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। ফলে দক্ষিণ বদরপুর, আবুপুর ও পূর্ব কৃষ্ণপুর এলাকা দিন দিন ভয়াবহ ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়ছে।

চারদিক দিয়ে নদীবেষ্টিত হওয়ায় এলাকাটি প্রতিনিয়ত ভাঙনের মুখে। যোগাযোগের জন্য রয়েছে কেবল কাঁচা মাটির রাস্তা; নেই কোনো টেকসই অবকাঠামো। কোন গ্যাস সংযোগ, পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন, পাকা রাস্তা-ঘাট, ইন্টারনেট, ডিশ লাইন এমনকি সরকারি কবরস্থান, ঈদগাহ বা খেলাধুলার মাঠের চাহিদাও নেই এখানকার মানুষের। শুধু দীর্ঘদিন ধরে নদী রক্ষা বাঁধ নির্মাণের দাবিই যেন তাঁদের মৌলিক অধিকারে রূপ নিয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এ এলাকায় নদী রক্ষা বাঁধ নির্মাণের জন্য বরাদ্দ থাকলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। এর ফলে বছরের পর বছর ধরে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে একরের পর একর উর্বর ফসলি জমি। ইতোমধ্যে বহু বসতবাড়ি ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও নদীতে তলিয়ে গেছে।

ভাঙনের তীব্রতায় আতঙ্কিত হয়ে সামর্থ্যবান পরিবারগুলো তাদের বসতঘর অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন। বর্তমানে প্রায় ১৫০টি পরিবার সরাসরি ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে। দরিদ্র মানুষজন রয়েছেন চরম অনিশ্চয়তায়, প্রতিদিনই নতুন করে ভাঙনের শঙ্কায় দিন কাটছে তাদের। তিন নদীর মোহনা হওয়ায় বছরের প্রায় প্রতিটি সময়ই ভাঙছে নদীর পাড়।

স্থানীয় মজিবুর রহমান বেপারী জানান, ভিটেমাটি অক্ষত থাকলেও আগাম সতর্কতায় ঘর সরিয়ে নিয়েছেন তিনি। দেলোয়ার বেপারী বলেন, “ভাঙন কাছে চলে আসায় আমি দূরে সরিয়ে নিয়েছি বসতঘর।” রুনু বেগম জানান, কষ্ট করে কিস্তির টাকা তুলে অন্যত্র ঘর সরাতে হয়েছে তাকে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি জানান, নয়া ভাঙলি নদীতে গত পাঁচ বছরে অন্তত ২৫০টি বসতঘর ও কয়েকটি মসজিদ-মাদরাসা বিলীন হয়েছে।

এলাকার বাসিন্দা মোতালেব চৌধুরী বলেন, “আমাগো এলাকা গাঙ্গে না ভাঙলে ঢাহার মতো উন্নত হইতো।”
ষাটোর্ধ্ব লাল মিয়া বলেন, “এই মাটিতে সব ধরনের ফসল হয়। ধান-পাট থেকে শুরু করে ডাল-গম সবই ফলে এখানে, অথচ নদীভাঙনে সবকিছু হুমকির মুখে।”

এলাকার তরুণ সমাজের মধ্যে আলহাজ্ব, শফিক, আরশাদ, লিখন, শাওন, শাহেদ, আবুল কালাম, সজিব, আব্দুল হক, শাহিন, বারেক, আনোয়ার, জাহেদুল, তানজিল, মোবারক, পারভেজ, জুলহাস, শামিম, ওমর, মাহমুদ ও মঈনসহ অনেকের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তাদের সবারই এক দাবি, চাঁদপুর শহর রক্ষা বাঁধের মতো একটি স্থায়ী নদী রক্ষা বাঁধ নির্মাণ।

তারা জানান, তাঁদের সংসদ সদস্য রাজীব আহসান একজন উন্নয়নমুখী তরুণ নেতা। তাই তাঁর ওপরই ভরসা রেখে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান তাঁদের।

এলাকাবাসীর আশঙ্কা, দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে পুরো অঞ্চলটি একদিন মানচিত্র থেকেই হারিয়ে যেতে পারে। তারা বর্তমান বিএনপি সরকারের কাছে জরুরি ভিত্তিতে নদী রক্ষা বাঁধ নির্মাণের জোর দাবি জানিয়েছেন।

চলবে… [১ম পর্ব]