মোস্তফা কামাল তোহাঃ মধ্যপ্রাচ্য আবারও জ্বলন্ত সংকটের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলকে কেন্দ্র করে চলমান উত্তেজনা শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্যের ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা, ড্রোন হামলা থেকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা পর্যন্ত স্পষ্ট করে দিয়েছে কোনো পক্ষই এই সংঘাত দ্রুত সমাধান করতে সক্ষম নয়।

ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অবস্থান বোঝার জন্য কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে তিনটি প্রধান পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনা করতে হয়। প্রথমত, সরাসরি সামরিক বিজয় সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতা ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু সম্পূর্ণ পরাজয় বা আঞ্চলিক প্রভাব হারানো দু’পক্ষের জন্যই বাস্তবসম্মত নয়। ফলে অসম্পূর্ণ শান্তি বা সামরিক লড়াইয়ের সীমিত বিরতি সবচেয়ে সম্ভাব্য।

দ্বিতীয়ত, এই সংঘাত আঞ্চলিক প্রক্সি যুদ্ধের মাধ্যমে বিস্তৃত হতে পারে। লেবানন, সিরিয়া, ইরাক এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে মিত্র গোষ্ঠীগুলো মারাত্মক প্রভাব ফেলতে সক্ষম। সামরিক অপারেশন সীমিত থাকলেও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে সংঘাত বহু বছর স্থায়ী অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।

তৃতীয়ত, এই পরিস্থিতি বৈশ্বিক শক্তি ভারসাম্যকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করবে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচনা করা হয়েছে। এই যেমন চীন, রাশিয়া ও অন্যান্য শক্তির প্রভাব বৃদ্ধি পেতে পারে। বিশ্ব রাজনীতিতে পশ্চিমা নেতৃত্বের প্রতি আস্থা হ্রাস পাওয়ায় বৈশ্বিক কূটনীতির নতুন লড়াই দেখা দিতে পারে।

অর্থনৈতিক দিকেও প্রভাব মারাত্মক। এরইমধ্যে হরমুজ প্রণালি তথা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের প্রধান পথ রুদ্ধ হয়েছে। এতে ক্রমেই তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে ও পাবে, যা বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি ও বাণিজ্যিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করবে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশও এই প্রভাব সরাসরি অনুভব করবে।

সংক্ষিপ্তভাবে, সম্ভাব্য শেষ পরিণতি হবে সীমিত সামরিক সংঘাতের মাধ্যমে পরিস্থিতি স্থিতিশীল করা হলেও মূল রাজনৈতিক ও কৌশলগত দ্বন্দ্ব অমীমাংসিত থাকবে। ইতিহাস প্রমাণ করে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ কখনো দ্রুত সমাধান হয় না, বরং তাদের ছায়া বহু দশক ধরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে প্রভাবিত করে।

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তেজনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যুদ্ধের সমাধান কেবল অস্ত্রের জোরে নয়, কূটনৈতিক প্রজ্ঞা, আঞ্চলিক সমঝোতা এবং আন্তর্জাতিক চাপের সমন্বয়ে অর্জনযোগ্য। তাই এই সংঘাতের ভবিষ্যৎ দৃশ্য অনিশ্চিত হলেও, সম্ভাব্য অসম্পূর্ণ শান্তি” ও দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার ছায়া প্রায় নিশ্চিত।