‘অপারেশন ল্যাংড়া’ নামে উত্তর প্রদেশে মুসলিমদের পঙ্গু করছে পুলিশ! 

ভারতের উত্তর প্রদেশে গরু পাচারের অভিযোগে শত শত মুসলিম পুরুষকে পুলিশের গুলিতে আহত করার ঘটনা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তাদের বেশির ভাগের পায়ে, বিশেষ করে হাঁটুর নিচে গুলি করা হয়েছে, যা পুলিশের ‘অপারেশন ল্যাংড়া’ নামক কৌশলের অংশ বলে মনে করা হচ্ছে। এ ঘটনাকে বিচারবহির্ভূত শাস্তি হিসেবে দেখছেন মানবাধিকারকর্মী ও সমালোচকেরা।

শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) বার্তা সংস্থা এপির প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

উত্তর প্রদেশ পুলিশ বলছে, আত্মরক্ষার জন্যই তারা গুলি চালায়। রাজ্য সরকারের অপরাধের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করেছে বলেও দাবি পুলিশের। তবে একই ধরনের গুলির ঘটনা ভারতের অন্য রাজ্যগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভারতে হাঁটুর ঠিক নিচে গুলি করার এই কৌশল—যা স্থানীয়ভাবে ‘অপারেশন ল্যাংড়া’ নামে পরিচিত—এখন অন্য রাজ্যগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ছে। বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশটিতে আইনের শাসন ও ধর্মীয় পক্ষপাত নিয়ে মানবাধিকার আইনজীবী, স্থানীয় বিচারক ও অধিকারকর্মীরা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।

২০২০ সাল থেকে প্রায় ৬৫০টি গুলির ঘটনা

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেটের সংকলিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে উত্তর প্রদেশে গরু পাচারের অভিযোগে প্রায় ৬৫০টি ঘটনায় সন্দেহভাজনদের গুলি করে আহত করা হয়েছে। এসব তথ্যের মধ্যে ২০০টির বেশি ঘটনা স্বাধীনভাবে যাচাই করেছে এপি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অধিকাংশ ঘটনায় সন্দেহভাজনদের হাঁটুর নিচে গুলি করা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা পালানোর চেষ্টা করছিলেন বা গুলি চালিয়েছিলেন, এরপর পুলিশ পাল্টা গুলি চালায়।

উত্তর প্রদেশের ফরেনসিক চিকিৎসাবিদ্যার অধ্যাপক মোহাম্মদ কলিম খান বলেন, পালিয়ে যাওয়া কোনো ব্যক্তির পায়ের পেশির মধ্য দিয়ে গুলি প্রবেশ করে হাড়ে আঘাত না করা—বিশেষ করে দূর থেকে এমনটি ঘটানো—অত্যন্ত অস্বাভাবিক। তার মতে, এ ধরনের ক্ষত কাছ থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে গুলি করার ইঙ্গিত দিতে পারে।

গবেষণা সংস্থাটির বিশ্লেষণ করা পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য থাকা ৬২৭টি ঘটনার মধ্যে ৯০ শতাংশের বেশি আহত সন্দেহভাজন মুসলিম ছিলেন। তবে পুলিশের প্রকাশ করা ঘটনার ওপর ভিত্তি করে তথ্য সংগ্রহ করায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ধর্মীয় পক্ষপাতের অভিযোগ অস্বীকার পুলিশের

উত্তর প্রদেশের জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা অমিতাভ যশ বলেছেন, পুলিশকে কেবল আত্মরক্ষার জন্য গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। সন্দেহভাজনদের পায়ে গুলি করার কোনো নির্দেশ নেই বলেও দাবি করেন তিনি।

আহতদের মধ্যে মুসলিমদের সংখ্যা বেশি হওয়ার পেছনে গবাদিপশুর ব্যবসায় তাদের অংশগ্রহণকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন এই কর্মকর্তা। তার দাবি, পুলিশের বিরুদ্ধে ধর্মীয় পক্ষপাতের অভিযোগ সঠিক নয়। তবে পুলিশের প্রতিটি পদক্ষেপের জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন বলেও তিনি স্বীকার করেন।

পুলিশের গুলিতে নিহতদের এক-তৃতীয়াংশ মুসলিম

প্রতিবেদনে পাওয়া রাজ্য পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, যোগী আদিত্যনাথ ২০১৭ সালের মার্চে উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে চলতি বছরের ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় ৩১৬ জন সন্দেহভাজন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১১০ জন, অর্থাৎ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মুসলিম।

অথচ রাজ্যটির মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ মুসলিম। একই সময়ে পুলিশের গুলিতে ১২ হাজার ৮৯০ জন সন্দেহভাজন আহত হয়েছেন। দায়িত্ব পালনকালে ১৮ পুলিশ সদস্য নিহত এবং ১ হাজার ৯৫৩ জন আহত হয়েছেন। তবে আহত সন্দেহভাজনদের ধর্মীয় পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শাসনামলে দেশটির ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র থেকে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতাকেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে ঝুঁকে পড়ার অভিযোগ তুলেছেন সমালোচকেরা। তাদের মতে, উত্তর প্রদেশে অপরাধ দমনের কঠোর নীতি মুসলিমদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে। তবে পুলিশ ধর্মীয় পক্ষপাতের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

গুলিতে পঙ্গুত্ব, বিপাকে পরিবার

এপি ছয়জন গুলিবিদ্ধ মুসলিমের স্বজনের সঙ্গে কথা বলেছে। প্রতিশোধের আশঙ্কায় তারা নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি। তাদের স্বজনেরা কেউ কারাগারে রয়েছেন, কেউ আত্মগোপনে আছেন।

দুই মা জানিয়েছেন, তাদের ছেলেরা মহিষের ব্যবসা করতেন। তাদের দাবি, মহিষ গরু সুরক্ষাসংক্রান্ত আইনের আওতাভুক্ত নয়। পুলিশের গুলিতে আহত হওয়ার পর তাদের ছেলেরা আর কাজ করতে পারছেন না। ফলে পরিবারগুলো অন্যের সাহায্য ও ছোট অঙ্কের ঋণের ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছে।

এক মা বলেন, তার ছেলে এখন খুঁড়িয়ে চলেন এবং কাজ করতে পারেন না। অন্যের দেওয়া সাহায্য নিয়েই তাদের দিন কাটছে।

সূত্র: এপি