কাজী নজরুল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রেরণা: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম শুধু অতীত ইতিহাস নন, তিনি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রেরণার উৎস। তিনি আমাদের যাপিত জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সকালে বাংলাদেশ সচিবালয়ে নজরুল বর্ষ উপলক্ষে আয়োজিত সভায় তিনি এ কথা বলেন।

তারেক রহমান বলেন, প্রতিটি রাষ্ট্র ও সমাজে কিছু ক্ষণজন্মা মানুষ আসেন, যারা আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক জীবন কিংবা সাহিত্য, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও মনোজগতে গভীর প্রভাব ফেলেন। কবি নজরুল তেমনই একজন। কৈশোর থেকে পরিণত বয়স—জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে তার প্রভাব অপরিসীম।

কাজী নজরুল ইসলামকে বিদ্রোহী কবি, প্রেমের কবি, বিরহের কবি, তারুণ্যের কবি, বাংলাদেশের ঐতিহ্যের কবি হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের জাতীয়, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে তিনি অবিস্মরণীয় নাম। পরাধীন, পর্যুদস্ত জাতির ভাগ্যাকাশে তার আবির্ভাব ছিল আলোকবর্তিকার মতো।

তিনি বলেন, পরাধীনতা, জুলুম, শোষণ, বৈষম্য, কুসংস্কার—সব অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে কবির কলম ছিল শাণিত অস্ত্র। বিপ্লব, বিদ্রোহ বা রণ-সঙ্গীত, ইসলামী গান কিংবা ভজন-কীর্তন, শ্যামা সংগীত, প্রেম, প্রকৃতি, মানবিক মূল্যবোধ—সব ক্ষেত্রেই নজরুলের প্রকাশ ছিল শুদ্ধ।

‘মাতৃভূমিকে ভালোবাসার ক্ষেত্রেও নজরুল অন্যতম দিশারি’ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের জীবন, স্বপ্ন, সংগ্রাম, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য তার রচনায় মহিমাময়ভাবে উঠে এসেছে। নজরুলের সৃষ্টিতে সব কালের, সব মানুষের আতিথ্য আছে।

তিনি বলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে তিনি আমাদের অনুপ্রেরণা। তার প্রাসঙ্গিকতা কখনো ফুরাবে না।

তারেক রহমান বলেন, আমাদের মুক্তিযুদ্ধে তার কবিতা ও গান যেমন অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে, তেমনি সব আন্দোলন-সংগ্রামে তার সৃষ্টি প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের ভাষা হয়ে উঠেছে।

তিনি বলেন, শুধু অতীত নয়, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও নজরুল প্রাসঙ্গিক। এ কারণেই জাতীয় কবির জীবন ও কর্মের সঙ্গে গণমানুষ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের সম্পর্ক গভীর করতে নানা আয়োজনে ‘নজরুল বর্ষ’ শুরু হয়েছে।

‘নজরুল বর্ষ’ উদযাপনে সবাইকে অভিনন্দন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকের অনুষ্ঠানে সরকারি কর্মকর্তা, নজরুল গবেষক ও সংগীতশিল্পী যারা আছেন, সবাইকে অভিনন্দন।

তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের অনুষ্ঠানে যেমন নজরুল গবেষকদের উপস্থিতি মানায় না, তেমনি নজরুল বর্ষের অনুষ্ঠানে আমলাদের চেয়ে নজরুল অনুরাগীদের অংশগ্রহণই বেশি কাম্য।

নতুন প্রজন্মের ওপর তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবের কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় তরুণ প্রজন্মকে সঠিক পথ দেখাতে নজরুলের ‘আমি হবো সকাল বেলার পাখি’ কিংবা ‘থাকব নাকো বদ্ধ ঘর’-এর মতো নৈতিক মূল্যবোধের কবিতা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

তিনি বলেন, নজরুল আমাদের যাপিত জীবনের অনিবার্য অংশ। তিনি কেবল অতীত নন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মেরও প্রেরণা।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমার মনে হয়, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম হলেন ‘বাংলাদেশের মন’। তিনি আজীবন সাম্যের গান গেয়েছেন, যেখানে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-খ্রিস্টানের ভেদাভেদ নেই। বর্তমান সরকারও এমন বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়তে কাজ করছে, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ ও প্রাণী নিরাপদ থাকবে।

এ সময় সারাদেশে নজরুল বিশেষজ্ঞ ও নজরুলপ্রেমীদের নিয়ে গঠিত ‘নজরুল বর্ষ উদযাপন জাতীয় কমিটি’র মাধ্যমে বছরব্যাপী সাহিত্য সম্মেলন, গবেষণা, সেমিনার, সাংস্কৃতিক উৎসব, নজরুল সংগীতের আসর, নাট্যোৎসব ও চিত্র প্রদর্শনী সফল করার আহ্বান জানান তিনি।

একইসঙ্গে জটিল বৈশ্বিক বাস্তবতায় নতুন প্রজন্মকে বিপথগামিতা থেকে রক্ষা করতে কবির নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন সাহিত্যকে আলোকবর্তিকা হিসেবে ব্যবহারের তাগিদ দেন প্রধানমন্ত্রী।

পরিশেষে জাতীয় কবির জীবন, কর্ম ও মানবিক চেতনার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ‘নজরুল বর্ষ ২০২৬-২০২৭’ এর বছরব্যাপী কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

পরে নজরুল বর্ষ উপলক্ষে বিশেষ স্মারক ডাকটিকিট ও লোগো উন্মোচন করা হয়।

সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, প্রধানমন্ত্রীর পলিসি ও স্ট্র্যাটেজি বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবু আব্দুল্লাহ এম ছালেহ (সালেহ শিবলী)।

উল্লেখ্য, সরকার ২০২৬ সালের ২৫ মে থেকে ২০২৭ সালের ২৫ মে পর্যন্ত সময়কে ‘নজরুল বর্ষ’ ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি কবির স্মৃতিবিজড়িত ময়মনসিংহের ত্রিশালকে ‘নজরুল সিটি’ ঘোষণার সম্ভাব্যতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও জানানো হয়।