তোফায়েল আহমেদ আর নেই

৪২

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকাঃ সাবেক মন্ত্রী, আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম মহানায়ক তোফায়েল আহমেদ আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না লিল্লাহি রাজিউন)। সোমবার (১ জুন) বিকাল সাড়ে ৩টায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও পারিবারিক সূত্র গণমাধ্যমকে তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, এই বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ দীর্ঘদিন ধরে প্যারালাইজডসহ বিভিন্ন বার্ধক্যজনিত শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর তাকে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর থেকে তিনি সেখানেই লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী আনোয়ারা বেগম এবং একমাত্র কন্যা ডা. তাসলিমা আহমেদ জামান মুন্নীসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী ও রাজনৈতিক অনুসারী রেখে গেছেন।

৯ বারের সংসদ সদস্য ও বর্ণাঢ্য জীবন

তোফায়েল আহমেদ দেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে অন্যতম সফল ব্যক্তিত্ব। তিনি মোট ৯ বার জাতীয় সংসদের সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হন। সর্বশেষ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ভোলা-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য হন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন।

এই মহান নেতা ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মৌলভী আজহার আলী এবং মা ফাতেমা বেগম।

শিক্ষাজীবন

তিনি ১৯৬০ সালে ভোলা সরকারি হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৬২ সালে বরিশাল ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। ১৯৬৪ সালে বিএসসি পাসের পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতকোত্তর (এমএসসি) ডিগ্রি লাভ করেন।

রাজনীতিতে হাতেখড়ি ও ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি প্রদান

তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক জীবনের শুরু ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ১৯৬৬-৬৭ মেয়াদে তিনি ইকবাল হলের (বর্তমান শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ভিপি নির্বাচিত হন। ১৯৬৮-৬৯ মেয়াদে ডাকসুর ভিপি হিসেবে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তার নেতৃত্বেই ঐতিহাসিক ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান তীব্র রূপ লাভ করে, যার ফলে পাকিস্তান সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে শেখ মুজিবুর রহমানসহ সকল আসামিকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহ্‌রাওয়ার্দী উদ্যান) লাখো জনতার উপস্থিতিতে এক বিশাল নাগরিক সংবর্ধনায় শেখ মুজিবুর রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন তরুণ ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ।

মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী রাজনৈতিক অধ্যায়

১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে তোফায়েল আহমেদ প্রথমবারের মতো আওয়ামী লীগের মনোনয়নে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি অন্যতম প্রধান গেরিলা বাহিনী ‘মুজিব বাহিনী’র অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চার প্রধানের একজন হিসেবে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি তিনি প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিবের দায়িত্ব লাভ করেন। এরপর ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি  আওয়ামী লীগ থেকে (নিজ জেলা ভোলায়) সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

মন্ত্রিত্ব ও ত্যাগী রাজনীতি

১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার গঠিত হলে তোফায়েল আহমেদ শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। পরবর্তীতে ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে তিনি সফলভাবে বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

রাজনীতি করতে গিয়ে এই নেতাকে বহুবার কারাবরণ করতে হয়েছে। ১৯৭৫ সালে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর সামরিক জান্তার শাসনামলে তিনি টানা ৩৩ মাসসহ জীবনের দীর্ঘ সময় কারাগারে কাটিয়েছেন। তার মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে  শূন্যতার সৃষ্টি হলো বলে মনে করছেন অনেক রাজনীতিকরা।