রাজশাহী অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে হাম: শনাক্তের হার ২৯ শতাংশ

৪২

রাজশাহী অঞ্চলে শিশুদের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছে সংক্রামক রোগ ‘হাম’। উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের নমুনা পরীক্ষা করে হামের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বিভাগের সাতটি সদর হাসপাতাল এবং চারটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় নিয়ে পরীক্ষা করছে। রাজশাহী বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. হাবিবুর রহমান জানান, মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহের মাঝামাঝি সময় থেকে রাজশাহী বিভাগের হাসপাতালগুলোতে হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুরা ভর্তি হচ্ছে।

পরে ১৮ মার্চ পর্যন্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৫৩ জনের নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করে। এতে ৪৪ জনের হাম পজিটিভ রিপোর্ট আসে। ছোঁয়াচে এই রোগ শনাক্তের হার প্রায় ২৯ শতাংশ। স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, হাম পজিটিভ ও উপসর্গ থাকা শিশুদের হাসপাতালে আলাদা রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, যাতে অন্য শিশুদের মাঝে সংক্রামক রোগটি ছড়িয়ে না পড়ে।

 

তবে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। শিশুদের ওয়ার্ডে অন্য সব শিশুর মাঝে হামের উপসর্গ থাকা শিশুদেরও চিকিৎসা চলছে। এমন রোগীদের আলাদা আইসোলেশন ব্যবস্থায় রাখার কথা থাকলেও বাস্তবে তাদের সাধারণ রোগীদের সঙ্গেই রাখা হচ্ছে। রাজশাহীতে একটি সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল থাকলেও এখন পর্যন্ত কোনো রোগীকে রামেক হাসপাতাল থেকে সেখানে স্থানান্তর করা হয়নি।

 

রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘হামের উপসর্গ নিয়ে যেসব রোগী আমাদের এখানে আসে, তাদের সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।’ তবে রামেক হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুদের ভর্তি থাকতে দেখা গেছে। গুরুতর অসুস্থ কোনো কোনো শিশুকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকজন শিশুকে আইসিইউতে নিয়েও বাঁচানো যায়নি।

 

বৃহস্পতিবার রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার আট মাস বয়সি জান্নাতুল মাওয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের সাত মাস বয়সি হুমায়রা, একই জেলার শ্রীরামপুর গ্রামের ৯ মাস বয়সি ফারহানা এবং কুষ্টিয়া সদরের পাঁচ মাস বয়সি হিয়াকে আইসিইউতে নিতে বলা হয়। হাসপাতালের রেজিস্টারে সবার রোগ ‘হাম’ উল্লেখ আছে।

 

এর মধ্যে হুমায়রা ও ফারহানা শুক্রবার সকালে মারা যায়। অন্য দুই শিশুকে এখনো সাধারণ ওয়ার্ডেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের আড়াই মাস বয়সি জহির নামের এক শিশুর মৃত্যু সনদে হাম-এর উল্লেখ পাওয়া গেছে। শিশুটির মা জেসমিন খাতুন জানান, তাঁর সন্তানকেও আলাদা না রেখে সাধারণ ওয়ার্ডেই চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল। ভর্তি হওয়ার তিন দিনের মাথায় ১৮ মার্চ সকালে শিশুটি মারা যায়।

রামেক হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক শাহিদা ইয়াসমিন বলেন, ডব্লিউএইচও ইতোমধ্যে ১০টি নমুনায় হাম নিশ্চিত করেছে, বাকি নমুনাগুলোতেও একই লক্ষণ পাওয়া যাচ্ছে।

এদিকে রামেক হাসপাতালে শিশু ওয়ার্ড থেকে হামে আক্রান্ত যে চার শিশুকে বৃহস্পতিবার আইসিইউতে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল, তাদের তিনজনই মারা গেছে। বেঁচে থাকা শিশু জান্নাতুল মাওয়াকে গতকাল আইসিইউতে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আরও তিন শিশুকে আইসিইউতে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

 

চলতি মাসে রামেক হাসপাতালে হামে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১২ শিশুর মৃত্যু হয়। এর মধ্যে আইসিইউতে নেওয়ার পরেও ৯ জনকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শঙ্কর কে বিশ্বাস বলেন, একটা বৈঠক হয়েছে। শনিবার থেকে আলাদা ওয়ার্ড করা সম্ভব না হলেও ২৪ ও ১০ নম্বর ওয়ার্ডে আইসোলেশন কর্নার করা হয়েছে। সেই কর্নারে রেখে হামের রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালের শিশু ও নবজাতক বিভাগের কনসালট্যান্ট মাহফুজ রায়হান জানান, শনিবার ৭০ শিশু হাম ওয়ার্ডে ভর্তি ছিল। বিকালে ছুটি দেওয়ার পর প্রায় ৫০ শিশু ছিল। তিন মাসে চারজন মারা গেছে। তাদের মধ্যে চলতি মাসেই দুজন মারা যায়।