ভেস্তে গেল শান্তি আলোচনা, চুক্তি ছাড়াই ফেরত যাচ্ছে মার্কিন প্রতিনিধি দল

২৮

টানা ৩৮ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিকে স্থায়ী রূপ দেওয়ার প্রথম বড় প্রচেষ্টাটি ব্যর্থ হয়েছে। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত ২১ ঘণ্টার এক শ্বাসরুদ্ধকর আলোচনা কোনো প্রকার সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে। দীর্ঘ আলোচনার পর কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে না পেরে মার্কিন প্রতিনিধি দল ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্যে রওনা হচ্ছে।

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এই তথ্য নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, তেহরান ওয়াশিংটনের দেওয়া শর্তসমূহ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানানোয় এই অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

জেডি ভ্যান্স জানান, পাকিস্তান সরকারের আতিথেয়তায় দুই দেশের প্রতিনিধি দল অত্যন্ত নিবিড় ও সরাসরি কথা বললেও শেষ পর্যন্ত মৌলিক বিষয়ে একমত হওয়া সম্ভব হয়নি। আলোচনার ব্যর্থতার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী না করে তিনি বলেন, “পাকিস্তান চমৎকার কাজ করেছে। তারা দুই দেশের মধ্যে ব্যবধান কমিয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে সর্বাত্মক চেষ্টা করেছে। আমরা সরাসরি কথা বলেছি, যা একটি ইতিবাচক দিক।”

তবে সমঝোতা না হওয়াকে ইরানের জন্য বড় দুঃসংবাদ হিসেবে দেখছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, “আমরা আমাদের ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমার বিষয়ে স্পষ্ট ছিলাম। কিন্তু ইরানি পক্ষ আমাদের শর্তগুলো মেনে না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইরানের জন্য অনেক বেশি খারাপ খবর।”

আলোচনার মূল কেন্দ্রে ছিল ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা। ভ্যান্স স্পষ্ট বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য হলো ইরান যাতে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে। তারা যাতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বা প্রযুক্তিও জোগাড় করতে না পারে—এমন একটি স্থায়ী ও মৌলিক প্রতিশ্রুতি আমাদের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তাদের কাছ থেকে দীর্ঘস্থায়ী সদিচ্ছার প্রমাণ আমরা এখনো পাইনি।”

উল্লেখ্য, ২১ ঘণ্টার এই আলোচনার সময় মার্কিন প্রতিনিধি দল অন্তত ১২ বার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেছে। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে একটি ‘চূড়ান্ত এবং সর্বোত্তম’ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা গ্রহণ করার জন্য এখন তেহরানের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে ।

এর আগে, ইরানের পরমাণু প্রকল্প এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে গত ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২১ দিন ধরে সংলাপ চলে তেহরান এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে। ২৭ ফেব্রুয়ারি কোনো প্রকার সমঝোতা চুক্তি ছাড়াই শেষ হয় সেই সংলাপ।

পরের দিন ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একই সময়ে ইরানে সামরিক অভিযান ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’ শুরু করে ইসরায়েলও। হামলার প্রথম ধাক্কাতেই নিহত হন ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তার পরিবারের সদস্যরা। যুদ্ধে ইরানের তিন হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারায় এবং আইআরজিসির শীর্ষ কমান্ডারসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা নিহত হন।

অন্যদিকে, ইরানও পাল্টা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন মিত্রদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তছনছ করে দিয়েছিল। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় মার্কিন তেল বাণিজ্যে বড় ধরণের ধস নামে। এই কঠিন পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে গত ৭ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ১৫ দিনের অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।

ইসলামাবাদের এই আলোচনা চলাকালেই লেবাননে ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর ভয়াবহ হামলা পুরো প্রক্রিয়ায় বিষ ঢেলে দিয়েছে। সমঝোতার ২৪ ঘণ্টা পার না হতেই লেবাননে ইসরায়েলের হামলায় ৩০০ জনের বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গেই বোঝাপড়া করে এই হামলা চালানো হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই দ্বিমুখী আচরণের কারণে ইরান এখন চরম সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সমঝোতা ব্যর্থ হওয়ায় এবং লেবাননে হামলা অব্যাহত থাকায় যেকোনো সময় অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তেহরান ইতোমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে যে তারা যেকোনো পরিস্থিতির জন্য সামরিকভাবে প্রস্তুত। ফলে ইসলামাবাদ থেকে মার্কিন প্রতিনিধিদের খালি হাতে ফিরে যাওয়া মধ্যপ্রাচ্যকে আবারও এক ভয়াবহ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিল কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।