স্পেনের কড়া পদক্ষেপ, মার্কিন সামরিক বিমানের জন্য আকাশসীমা বন্ধ

৪২

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা এখন আর শুধু আঞ্চলিক সংকটে সীমাবদ্ধ নেই, এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে পশ্চিমা জোটের ভেতরেও।

 

বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর নেতৃত্বে ইরানে সামরিক পদক্ষেপের বিরোধিতা করে স্পেন এমন এক সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা ন্যাটো জোটের অভ্যন্তরেই নতুন ধরনের বিভাজনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

 

সোমবার (৩০ মার্চ) স্পেন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয় যে, ইরানে হামলায় নিয়োজিত কোনো মার্কিন যুদ্ধবিমান তাদের আকাশসীমা ব্যবহার করতে পারবে না।

 

একই সঙ্গে স্পেনের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি—রোটা ও মোরন—ব্যবহারের অনুমতিও বাতিল করা হয়েছে। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এই যুদ্ধকে “অবৈধ”, “বেপরোয়া” এবং “অন্যায্য” আখ্যা দিয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে একতরফা সামরিক পদক্ষেপ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

 

স্পেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী Margarita Robles সিদ্ধান্তটি নিশ্চিত করে স্পষ্ট ভাষায় জানান, ইরান-সংক্রান্ত কোনো সামরিক অভিযানের জন্য স্পেনের আকাশসীমা বা ঘাঁটি ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।

 

তিনি বলেন, “এই যুদ্ধ পুরোপুরি বেআইনি ও অন্যায়। তাই এ ধরনের কোনো কর্মকাণ্ডে স্পেন অংশ নেবে না।” সরকারের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, এটি আগেই নির্ধারিত একটি নীতিগত অবস্থানের অংশ।

 

তবে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে। মানবিক বিপর্যয়, জরুরি উদ্ধার কার্যক্রম বা বিশেষ প্রয়োজনের ক্ষেত্রে এই নিয়ম কিছুটা শিথিল করা হতে পারে বলে জানিয়েছে স্পেন।

 

 

এর ফলে বোঝা যাচ্ছে, স্পেন কেবল সামরিক আগ্রাসনের বিরোধিতা করছে—মানবিক সহায়তা নয়।

 

স্পেনের এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। আগে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে যুক্তরাজ্য থেকে মধ্যপ্রাচ্যে অভিযানে যাওয়া মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো সহজেই স্পেনের আকাশপথ ব্যবহার করতে পারত।

 

এখন সেই পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যুদ্ধবিমানগুলোকে দীর্ঘ পথ ঘুরে যেতে হচ্ছে, যা সময় ও জ্বালানি—উভয় ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।

 

রোটা ও মোরন ঘাঁটি দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপ, আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক অভিযানের অন্যতম প্রধান লজিস্টিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

 

বিশেষ করে রোটা ঘাঁটি মার্কিন নৌবাহিনীর ষষ্ঠ ফ্লিটের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করতে না পারায় যুক্তরাষ্ট্রকে বিকল্প ঘাঁটির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা তাদের অপারেশনকে আরও জটিল করে তুলছে।

 

এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি স্পেনের বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। তবে হোয়াইট হাউস থেকে জানানো হয়েছে, “অপারেশন এপিক ফিউরি” পরিচালনায় স্পেনের সহযোগিতা ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র তার লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম।

 

স্পেনের অর্থনীতিবিষয়ক মন্ত্রী কার্লোস কুয়েরপো জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে কোনো ধরনের সহায়তা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত আগেই নেওয়া হয়েছিল।

 

 

এছাড়া স্পেনের পার্লামেন্টেও প্রধানমন্ত্রী আগে থেকেই স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, জ্বালানি সরবরাহকারী (রিফুয়েলিং) বিমানসহ ইরান যুদ্ধ সংশ্লিষ্ট কোনো ফ্লাইট পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে না।

 

তবে স্পেন ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক চুক্তি অনুযায়ী ইউরোপে মোতায়েন প্রায় ৮০ হাজার মার্কিন সেনার নিয়মিত রসদ সরবরাহ বা লজিস্টিক কার্যক্রমের জন্য রোটা ও মোরন ঘাঁটির ব্যবহার চালু থাকবে।

 

অর্থাৎ, নিষেধাজ্ঞাটি শুধুমাত্র ইরানকে লক্ষ্য করে সরাসরি সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে।

 

সব মিলিয়ে, স্পেনের এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি সামরিক বা কৌশলগত পদক্ষেপ নয়—এটি আন্তর্জাতিক আইন, নৈতিক অবস্থান এবং কূটনৈতিক স্বাধীনতার একটি স্পষ্ট বার্তা।

 

 

একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী সামরিক অবস্থান, অন্যদিকে স্পেনের নীতিনিষ্ঠ প্রতিবাদ—এই দ্বন্দ্ব ভবিষ্যতে ন্যাটো জোট এবং বৈশ্বিক রাজনীতির গতিপথে কী প্রভাব ফেলে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তথ্যসূত্র : ফক্স নিউজ