শোকজের একদিন পরই বদলি করা হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৩ কর্মকর্তাকে

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরকে ‘স্বৈরাচার’ আখ্যা দিয়ে সংবাদ সম্মেলন করার জেরে তিন কর্মকর্তাকে শোকজের পরদিনই তাদের বদলি করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগ থেকে জারি করা এক আদেশে তাদের নতুন কর্মস্থলে পদায়ন করা হয়।

বদলি হওয়া কর্মকর্তারা হলেন—বাংলাদেশ ব্যাংকের নীল দলের সাধারণ সম্পাদক ও এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস বিভাগের পরিচালক নওশাদ মোস্তফা, নীল দল থেকে নির্বাচিত বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের সভাপতি এ কে এম মাসুম বিল্লাহ এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা শ্রাবণ।

আদেশ অনুযায়ী, নওশাদ মোস্তফাকে প্রধান কার্যালয় থেকে বরিশাল অফিসে, মাসুম বিল্লাহকে রংপুর অফিসে এবং গোলাম মোস্তফা শ্রাবণকে বগুড়া অফিসে বদলি করা হয়েছে।

এদিন এক সংবাদ সম্মেলনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, তিন কর্মকর্তার শোকজের জবাব সন্তোষজনক না হলে বিধি অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শোকজের জবাব পর্যালোচনা করা হবে। তা সন্তোষজনক না হলে উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করে তদন্ত করা হবে।

কমিটির প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট বিধির ধারা উল্লেখ থাকবে এবং সেই অনুযায়ী পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান।

এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন নীতি ও সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে সংবাদ সম্মেলন করায় গতকাল সোমবার প্রতিষ্ঠানটির ওই তিন কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের পরদিন গত ১৩ ফেব্রুয়ারি আয়োজিত ওই সংবাদ সম্মেলনে তারা গভর্নরকে ‘স্বৈরাচার’ উল্লেখ করে দুর্বল ব্যাংক একীভূতকরণ, ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স প্রদানসহ একাধিক ইস্যুতে প্রশ্ন তোলেন।

এ ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ১০ দিনের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়। জবাব পাওয়ার পর বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছিল।

ওই সংবাদ সম্মেলনে তারা গভর্নরের কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এর মধ্যে ছিল দুর্বল ব্যাংক একীভূতকরণ, ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া।

কর্মকর্তারা অভিযোগ করেন, তুলনামূলকভাবে কম দুর্বল এক্সিম ব্যাংক ও সোস্যাল ইসলামী ব্যাংককে পাঁচটি ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ। ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ–২০২৫ এর আওতায় এরই মধ্যে পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে সরকারি মালিকানায় একটি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে।

এছাড়া তারা দাবি করেন, বিকাশকে দ্রুত ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্সসহ মোট আটটি এজেন্ডা নিয়ে ওইদিন পরিচালনা পর্ষদের বৈঠক ডাকা হয়েছিল। পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্রের দপ্তর থেকেও জানানো হয়, শুধু বিকাশকে লাইসেন্স দেওয়ার জন্য সভা আহ্বান করা হয়নি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্টাফ রেগুলেশন অনুযায়ী, কোনো কর্মকর্তা সংবাদ সম্মেলন বা প্রকাশ্য বক্তব্য দেওয়ার আগে গভর্নরের অনুমোদন নিতে বাধ্য। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়ে আপত্তি থাকলে তা অভ্যন্তরীণ ফোরামে উত্থাপনের সুযোগ রয়েছে। এই বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগেই তিন কর্মকর্তাকে শোকজ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

সংবাদ সম্মেলনের দিন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর কয়েকটি গণমাধ্যমে বলেন, নির্বাচনের পর একটি পক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে পরিস্থিতি ঘোলা করার চেষ্টা করছে। পরিচালনা পর্ষদের আলোচ্য বিষয় প্রকাশ্যে আনা শৃঙ্খলাভঙ্গের শামিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে গোলাম মোস্তফা শ্রাবণ বলেন, ব্যাংক খাতে ‘খেয়ালি বক্তব্য’ পরিহার করে বস্তুনিষ্ঠ প্রক্রিয়ায় ব্যাংক রেজল্যুশন নিশ্চিত করতে হবে। মাসুম বিল্লাহ বলেন, তারা প্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসন চান, কোনো ব্যক্তির নয়। তার ভাষায়, স্বায়ত্তশাসন মানে এই নয় যে প্রতিষ্ঠানের প্রধান একনায়ক বা স্বৈরাচার হয়ে উঠবেন।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ওই দিন তিনি আরও বলেন, আগে কথা না বললেও এখন নীরব থাকলে ভবিষ্যতে প্রশ্ন উঠতে পারে। নওশাদ মোস্তফা বলেন, ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান না ঘটলে হয়তো আমরা এতটা খোলামেলা হতাম না।