যেকোনো সময় ইরানে হামলার সম্ভাবনা: যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত কোন পথে?

মোস্তফা কামাল তোহাঃ মধ্যপ্রাচ্যে আবারও অস্থিরতা ঘনীভূত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনা ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নানা জল্পনা তৈরি হয়েছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা, পারমাণবিক ইস্যু এবং বড় শক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক অবস্থান সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করেছে।

দীর্ঘদিন ধরেই ওয়াশিংটন ও তেহরানের সম্পর্ক উত্তেজনাপূর্ণ। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি, জয়েন্ট কমপ্রেহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন, আন্তর্জাতিকভাবে উত্তেজনা কমানোর একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি থেকে সরে গেলে সম্পর্ক আবারও তলানিতে ঠেকে। এরপর থেকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে, যার তদারকি করছে ইনটারন্যাশনাল অ্যাটোমিক এনার্জি এজেন্সি।

এদিকে আঞ্চলিক রাজনীতিতে ইরান ও ইসরায়েল এর প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন নয়। নিরাপত্তা ও প্রভাব বিস্তার নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থান বরাবরই বিপরীতমুখী। যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহ্যগতভাবে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র, পাশাপাশি তার সঙ্গে রয়েছে ন্যাটো জোট। তবে ন্যাটোর প্রতিটি সদস্য যে মধ্যপ্রাচ্যের সম্ভাব্য যুদ্ধে সরাসরি জড়াবে, এমনটি স্বয়ংক্রিয় নয়; সদস্য রাষ্ট্রগুলোর নিজস্ব কৌশলগত সিদ্ধান্ত এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

অন্যদিকে, চীন ও রাশিয়া ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। তারা সাধারণত পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও একতরফা সামরিক পদক্ষেপের সমালোচনা করে থাকে। তবে সরাসরি সামরিক সংঘাতে তারা জড়াবে কি না, তা অনেকাংশে নির্ভর করবে পরিস্থিতির গভীরতা ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রেক্ষাপটের ওপর। বৃহৎ শক্তিগুলো সাধারণত প্রত্যক্ষ সংঘর্ষ এড়িয়ে কূটনৈতিক বা পরোক্ষ সমর্থনের পথ বেছে নেয়।

ইরান একাধিকবার জানিয়েছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত। একই সঙ্গে তারা সতর্ক করেছে যে সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত এলে জবাব কঠোর হতে পারে। পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে যে কোনো উত্তেজনামূলক বক্তব্য আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ায়, কারণ এ ধরনের পরিস্থিতি দ্রুত আঞ্চলিক সংঘাতকে বৈশ্বিক সংকটে রূপ দিতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, সম্ভাব্য কয়েকটি দৃশ্যপট সামনে রয়েছে। প্রথমত, সীমিত পরিসরের সামরিক পদক্ষেপ ও পাল্টা জবাব, যা নির্দিষ্ট স্থাপনা বা লক্ষ্যবস্তুতে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। দ্বিতীয়ত, সরাসরি সংঘাতের বদলে প্রক্সি বা আঞ্চলিক মিত্রদের মাধ্যমে চাপ প্রয়োগের কৌশল। তৃতীয়ত, উত্তেজনা বাড়লেও শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক আলোচনায় ফিরে যাওয়ার পথ খোলা থাকতে পারে। পূর্ণমাত্রার আঞ্চলিক যুদ্ধের সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম হলেও সেটি ঘটলে জ্বালানি বাজার, সমুদ্রপথে বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

তেলের বাজার ইতোমধ্যে সংবেদনশীল অবস্থায় রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি সরবরাহকারী অঞ্চল হওয়ায় এখানে সামান্য অস্থিরতাও আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা ঘটাতে পারে। একই সঙ্গে শেয়ারবাজারে অনিশ্চয়তা, মুদ্রাবাজারে চাপ এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্নের আশঙ্কা বাড়ে।

সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখনও অনিশ্চিত। সরাসরি বৃহৎ আকারের যুদ্ধের চেয়ে নিয়ন্ত্রিত উত্তেজনা ও কূটনৈতিক চাপ-পাল্টা চাপের রাজনীতি বেশি সম্ভাব্য বলে মনে করছেন অনেক পর্যবেক্ষক। তবে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি দ্রুত বদলাতে পারে। এছাড়াও যে কোনো ছোট ঘটনারও বড় প্রভাব পড়ার নজির রয়েছে। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি এখন পরবর্তী পদক্ষেপ ও কূটনৈতিক তৎপরতার দিকে।